এ এক অন্যমহামারী –শতাব্দীকাল ধরে নীরবে নিচ্ছে প্রাণ

ঘর মানুষের অতিকাঙ্ক্ষিত পরম শান্তির স্থান।একটি ঘরের স্বপ্ন ছেলে-মেয়ে সবাই দেখেন। অথচ এই ঘরই একেক সময় কিছু মানুষের জীবনে দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

লকডাউন ঘোষিত হওয়ার দ্বিতীয় দিন থেকেই ফোন আসা শুরু হয়ে যায়। প্রথম ফোনটি করে একটি কিশোর ছেলে। মাকে নিয়ে বাবার বিরুদ্ধে এজাহার দিতে গেছে। পুলিশ নিতে চাইছেনা। আমি যেহেতু মানবাধিকার সংস্থায় কাজ করি আমরা সাহায্য করতে পারব কিনা। বাকিটা কল্পনা করা খুবই সহজ। দু-তিনবার ফোন করার পর এজাহার দায়ের করা গেলেও তদন্ত না-এর গতিতে হচ্ছে।

দু-একদিন পর থেকে খবরের কাগজগুলোতে এরকম ঘটনা রিপোর্ট আসতে শুরু করে।কোথাও মদ খেতে না পেরে বউপেটানো হচ্ছে, তো কোথাও বাচ্চাদের দেখশুনা ঠিকমতো হচ্ছেনা এই অভিযোগে মহিলাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হচ্ছে। তবে একটি কথা ক্রমশ স্পষ্ট হতে থাকে যে লকডাউনের ফেলে মেয়েদের সহ্য করতে হচ্ছে দ্বৈতমার। প্রথমত থানায় যেতেই পারছেননা। যদিও বা থানায় কোনোক্রমে পৌঁছতে পারছেন পুলিশ ব্যস্ততার বাহানায় এজাহার নিতে মানা করে দিচ্ছে। বেসরকারি সংস্থাগুলো যদিও টোল-ফ্রি নাম্বার, অনলাইন কাউন্সিলিং ইত্যাদির সুযোগ করে দিচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই পোড়া দেশে ক’জন মহিলা এসবের সুযোগ নিতে পারবেন? প্রান্তিক মহিলাদের কথা ক’জন ভাবছেন?

খোদ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে বিশ্বে প্রতি তিনজন মহিলার একজন গার্হস্থ্য হিংসার শিকার। ভারতে ন্যাশনাল ক্রাইম ব্যুরোর মতে ২০১৮ সালে প্রায় নব্বই হাজার মামলা রুজু হয়েছে। আর একথা কোনো টপ-সিক্রেট নয়, যে রাষ্ট্রে যখনই কোন সামাজিক বা রাজনৈতিক অস্বাভাবিক অবস্থার সৃষ্টি হয় মেয়েদের উপর অত্যাচারের হারও পাল্লা দিয়ে বেড়ে যায়। শুধু স্বামী বলে নয় বাড়ির বাকি প্রভুশ্রেণির মহিলারাও কম যাননা। তারাও নিজেদের মানসিক হীনমন্যতা মেটাতে কিংবা স্বাভাবিক কর্তৃত্ব ফলাতেও অন্যমেয়েদের কেই বেছে নেন।

চিনে নাকি ফেব্রুয়ারিতে আগের তুলনায় তিনগুণ বেশি ঘটনা রিপোর্ট হয়েছে। বিশিষ্ট সমাজকর্মী রেজোন্স এর মতে, গৃহহিংসা ক্ষমতা এবং নিয়ন্ত্রণের মানবীয় প্রবৃত্তির সাথে জড়িত যা কিনা আমাদের দেশের পুরুষ সিংহদের জন্মের পর থেকেই পই পই করে মাথায় ঢোকানো হয় এবং যেহেতু বর্তমানে লকডাউনের ফলে বিশ্বের পুরুষেরা নিজেদের জীবনযাত্রার উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন, তাই তারা আনুষাঙ্গিক হীনমন্যতায় ভুগছেন। তাই এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে এরই বলি হতে হচ্ছে মেয়েদের।

যারা আগে থেকেই এরকম হিংসার শিকার হচ্ছিলেন তাদের উপর হিংসা আরোও বেড়ে গেছে।লকডাউনের ফলে তারা কারোর কাছে সাহায্যও নিতে পারছেন না।
তাছাড়াবিশ্ব-অর্থনীতি যে সঙ্কটের মুখে পড়ছে তার ফলেও বেড়ে যেতে পারে মেয়েদের সাথে ঘটা অপরাধের হার।

এ এক অন্যমহামারী। যুগ যুগ ধরে এর ফলে বিশ্ব থেকে হারিয়ে গেছেন প্রায় ৭০ মিলিয়ন মানবী।আজ গার্হস্থ হিংসা শুধু শারীরিক নির্যাতনের মধ্যেই থেমে নেই। মানসিক নির্যাতন, অবহেলা, কটুকথা, অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী হতে বাধা দেওয়া ইত্যাদিও আছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো মহিলাদের সাথে সাথে এর শিকার হন তাদের সন্তানেরাও। তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটতে পারে এবং ঘটছেও। এমনকি শুধু গার্হস্থ হিংসা নয় শিশু নির্যাতনের সংখ্যাও বাড়ছে।
বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলো ইতিমধ্যে নড়েচড়ে বসেছে। ফ্রান্স নির্যাতিতদের উদ্ধার করে হোটেলে থাকার বন্দোবস্ত করে দিচ্ছে। ইতালি আর ব্রিটেন সম্ভবত ঘরের মধ্যেই আলাদা ঘরের ব্যাবস্থা করছে। ভারতে জাতীয় মহিলা কমিশনযদিও একটি হোয়াটস্যাপ নাম্বার চালু করেছে। কিন্তু মোবাইলই বা কজনের আছে? আর থাকলেও মহিলাদের কাছে এই নাম্বারটা পৌঁছাবেই বা কীভাবে?

এই অবস্থায় সরকার যদি এগিয়ে আসার সদিচ্ছা না দেখান তাহলে অবস্থা আরোও বেগতিক হবে। তাছাড়া ব্যক্তিগতভাবে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। নিজেদের আশেপাশে সতর্ক দৃষ্টি রাখুন। গৃহহিংসা জনিত কোনো ঘটনা ঘটছে এমন টের পেলে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিন। সরকারি এবং বেসরকারি হেল্পলাইন নাম্বারগুলো বেশি বেশি করে সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

ভাবুন একদিকে পরিযায়ী শ্রমিকরা হাজার হাজার মাইল হাঁটছেন শুধু বাড়ি ফেরার জন্য, অন্যদিকে আরেক অংশ নিজের হাতে সাজানো আপাতত সুখী গৃহকোণগুলোকে নরক হয়ে যেতে দেখছেন। এটাই হয়তো জীবনের কন্ট্রাস্ট। এ এক অন্য মহামারী৷ যার ফলে একটি লিঙ্গ কয়েক শতাব্দী ধরে নীরবে খুন হয়ে যাচ্ছে। আর মুশকিল হল কোনও ধরনের বড়ি খেয়ে এরোগ কমবেনা। এর জন্য মানুষকে নিজেদের মগজে পরিবর্তন আনতে হবে। পিতৃতন্ত্রের ছক থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা হল এগুলোকে জলজ্যান্ত সমস্যা হিসেবে মেনে নিয়ে রাষ্ট্রীয় নীতিতে গুরুত্ব দিয়ে শামিল করতে হবে। লকডাউনের মতো বিশেষ জরুরিকালীন সময়ে আগে থেকেই এসবের প্রতিরোধ এবং প্রতিকারের ব্যাবস্থা ভাবতে হবে।

লেখিকা- তানিয়া সুলতানা লস্কর।(আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী,শিলচর)

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here