বিশ্বের ‘সর্বাধিক পঠিত গ্রন্থ’ কোরান এবং সবচেয়ে অচর্চিত জাতি মুসলমান

কয়েকদিন আগেই বুদ্ধ পূর্ণিমা গেল। গৌতম বুদ্ধ ওরফে সিদ্ধার্থ কে নিয়ে অনেক লেখা পড়লাম।অনেক কিছু নূতন জিনিস জানলাম।

 বুদ্ধের সংসার ত্যাগ, সিদ্ধিলাভ,জীবন দর্শন,হীনযান ও মহাযানের উদ্ভব ইত্যাদি নিয়ে অনেকেই লিখেছেন।সমৃদ্ধ হয়েছি। তার মধ্যে আস্তিক, নাস্তিক, অজ্ঞেয়বাদী সবাই আছেন। অর্থাৎ, তিনি এবং তার মত চর্চিত।

যীশু খ্রীষ্ট কে নিয়ে যে চর্চা হয় তা পৃথিবীর সবথেকে বেশি বিক্রি হওয়া বই ‘বাইবেল’ কে দেখেই বোঝা যায়! মনে আছে মাদার টেরেজার ‘Saint’ উপাধি পাওয়ার দিনের কথা। সেদিন মাদারের সেবাব্রতের কাহিনী, তাঁর অলৌকিক ক্ষমতার গল্প এবং ‘ক্যানানাইজেশন’ ইত্যাদি নিয়ে অনেক মানুষের লেখা পড়েছিলাম। অর্থাৎ, তাঁরা চর্চা করেন।

রামায়ণ, মহাভারত নিয়ে চর্চা ভারতের অলিতে গলিতে,সেই ছোটবেলা থেকেই। প্রাইমারি স্কুলেই সাবার করেছিলাম ‘ছোটদের রামায়ণ’ ও ‘ছোটদের মহাভারত’! মেজ বুবুর বাংলায় অনার্স নিয়ে পড়ার সুবাদে জানি ‘শ্রী কৃষ্ণকীর্তন’ তো বাংলা অনার্সের সিলেবাসেও আছে। অর্থাৎ, চর্চা হয়।

এই চর্চা টার গণ্ডি থেকে কোথাও যেন সার্বিক মুসলমান সমাজ টা যেন ব্রাত্য। ‘মুসলমান’ নাম শুনলেই যেন একটা ছোঁয়াছুঁতের ব্যাপার আছে সর্বত্র!আমাদের ‘মুসলমান’ চর্চা নেই বললেই চলে বা থাকলেও ওই বিরিয়ানি-হালিম আর খুব বেশি হলে জাকারিয়া স্ট্রিট অব্দি। এবং সেই অজ্ঞতা স্পষ্ট হয় যখন শুনি – “তুমি মুসলমান? বাঙালি বলেই তো জানতাম!”

আমরা অশ্বত্থ গাছের নীচে গৌতম বুদ্ধের টানা ৪৫ দিন তপস্যার কথা জানি কিন্তু মুহাম্মাদের হেরা পর্বতের গুহায় টানা ৪০ দিন তপস্যার কথা জানিনা। মুহাম্মাদ সম্পর্কে আমাদের বেশিরভাগের ধারণার দৌড় ওই ১ ডজন বৌ থাকা অব্দি!

আমরা খ্রীষ্টের জীবনি থেকে চৈতন্য মহাপ্রভুর ভাবসমাধি জানি কিন্তু আবুবকর বা ওমরের নাম শুনিনি! ক্রুশেড জানি, পানিপথ জানি, মহাভারতের যুদ্ধ জানি কিন্তু কতজন বদর,ওহুদ নাম শুনেছি? শুনিনি!

চর্যাপদ বা শ্রীকৃষ্ণ কীর্তনের ছন্দ তাল কাব্য সাহিত্য নিয়ে রচনা রয়েছে বহু কিন্তু কোরানের কাব্য বা সাহিত্য বা গুণাবলি নিয়ে কোন চর্চা নেই। অথচ কোরানের ছন্দ স্পষ্ট হয় আয়াত গুলোতে। যেমন-

” ইন্না আ’ত্বয়না কাল-কাউসার /ফাসাল্লি লিরব্বিকা ওয়ানহার / ইন্না শানিয়াকা হুয়াল আব্বতর!”

এবং অদ্ভুত ভাবে কোরানের উপরোক্ত আয়াতের নাজেল ও কবিতার লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই। কাকাতুয়ার বুলির মতো কোরান আওড়ানো মুসলমান রাই বা তা জানে কতটুকু?

মুসলমান সমাজ ও তাদের জীবন যাত্রা নিয়ে চর্চার কথা আর নাই বা বললাম! আমাদের চর্চার সীমা ওই- ‘মুসলমান রা গণ্ডা গণ্ডা বাচ্চা উতপাদন করে’ টাইপ বদ্ধ ধারণা অব্দি। আমরা সম্প্রীতির কথা বলি ঠিক ই, অথচ আমাদের পরিচিতিই নেই ‘দস্তরখান’ বা ‘চিলমচি’র সাথে! গ্রাম্য মুসলমান সমাজের বিবাহ গীত অথবা পিংলার নয়াগ্রামের মুসলমান সমাজের পট চিত্রে কৃষ্ণ গীতের কথা কেউ জানিনা! আমরা সুবিধাবাদী রাজনৈতিক চর্চার দৌলতে ‘তিন তালাক’ জানি অথচ জানিনা ‘দেন মোহর’ এর কথা! ‘লাশ লোয়ানো’ বা ‘কাফন’ এর কথা তো কেউ ই জানিনা! মাসি, পিসি, দিদা, দাদু জানি কিন্তু খালা, ফুপু, নানি, নানা জানিনা।আমাদের যেটুকু জানা তা ওই সিনেমা সিরিয়ালের গলায় মাদুলি, মাথায় টুপি আর হিজাব অথবা আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন হিসেবে কোন চরিত্রের কথা! পারস্পরিক পরিচিতি,জানার ক্ষেত্র প্রসারিত না হলে সম্প্রীতির ফাঁকা বুলি আওড়ানো টা অত্যন্ত শ্রুতিকটু।

প্রতিটি মুসলিম বাড়িতে এক থেকে একাধিক কোরান থাকে, রমযান মাসে প্রায় প্রতটি মসজিদে কোরানের ৬,৬৬৬ টা আয়াত শেষ করা হয়, প্রতিটি বাড়িতে এই মাসে এবং অন্যান্য মাসেও কোরান পড়ার রেওয়াজ আছে- সেদিক থেকে কোরান বিশ্বের সর্বাধিক পঠিত গ্রন্থ! কিন্তু কয়েক বিলিয়ন জনসংখ্যার মুসলমান সমাজ টা চর্চার আড়ালে আজ ও!

তবে এই যে একটা সমাজ আজ আধুনিক দুনিয়ার আলোচনায় প্রায় ব্রাত্য বললেই চলে তার কারণ ঠিক কি? মুসলমান সমাজের কি কোন দায় নেই? আছে। এবং তা হল শিক্ষার চর্চা। বিভিন্ন মিশন স্কুলের দৌলতে মুসলমান সমাজে শিক্ষার একটা ঝাঁকুনি লেগেছে তবে নিজ সমাজ কে লেখালেখি, চিত্রকলা, সিনেমা নাটক ইত্যাদির মাধ্যমে তুলে ধরতে আমরা পারিনি। আমাদের মুসলমান সমাজ অনেকাংশেই রয়ে গ্যাছে ‘আরবী’ নির্ভর হয়ে, বিরুদ্ধ মত কে প্রশ্র‍য় দেওয়া তো দূরের কথা, কাউকে নিজের মতো করে বলার সুযোগ ও যে আমরা তৈরি করতে পারিনি তা অনস্বীকার্য। আরবী নির্ভরতা আমাদের এতটাই বেশি যে আমরা পাখির বুলির মতো কোরান কে বারবার পড়ে ‘বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পঠিত গ্রন্থ’ করেছি, কিন্তু তার বাইরের পড়াশোনা? নেই! আমরা অন্যান্য সাংস্কৃতিক চর্চা গুলো কে ‘গোনাহ’ এর ভয় দেখিয়ে আমাদের সমাজে তা প্রবেশ করতে দিইনি আবার আমরা নিজেরা কোন সামান্তরাল সাংস্কৃতিক অঙ্গন ও দিতে পারেনি আমাদের সমাজ কে!
শুধু তাই নয়, মুসলমান সমাজের একটা বড় অংশ ধর্মীয় সমালোচনা সহ্য করতে পারেন না। তারা ধর্মীয় বিধান, ইসলামের ইতিহাস সহ নানা বিষয়ের বিরুদ্ধাচরণ বা প্রশ্নবাণ কে তিক্ত ভাবে নেন এবং নানা সময়েই ফতোয়া জারি করেন। চর্চার সুযোগ দেওয়া টা জরুরি। কেউ মোহাম্মদের জীবনী পড়ে তাঁকে ‘পিডোফাইল’ প্রতিপন্ন করতে চায় করুক, আর কেউ তাঁকে ‘মহান মানবতাবাদী’ বলে প্রতিপন্ন করতে চাইলে সেও তাই করুক। কিন্তু কর‍তে দেওয়া টা জরুরি। ভালো-খারাপ উভয়ের চর্চা না হলে তুলনামূলক আলোচনা হবে কি করে? অথচ আমরা সেই সুযোগ কাউকে কখনো দিইনি বরং ফতোয়া জারি করেছি, দেশ ছাড়া করেছি লেখক কে, পাল্টা যুক্তি দিয়ে আর একটা বই প্রকাশ করে লেখায়-লেখায় যুদ্ধ না চালিয়ে কলমে-তরোয়ালের যুদ্ধে রত হয়েছি।

তবে সব টাই কি শুধু মুসলমান সমাজের গোঁড়ামি আর স্ব – চর্চার অভাব? অবশ্যই না। আমরা কখনো চোখ মেলে তাকাই নি পাশের বাড়ির বা পাশের পাড়ার মুসলিম প্রতিবেশির দিকে। ওরা ‘ গোরু খায় ‘ তাই অচ্ছুৎ, বাড়িতে এলে গঙ্গাজল, টুপি পড়ে তাই ‘টেররিস্ট’ ইত্যাদি বলে ও করে সমাজ টাকে আরো কোণ ঠাসা আরো প্রান্তিক করে তুলেছি। অথচ, রহিম চাচার বাড়ি গিয়ে দেখবেন তিনি আপনাকে বাড়ির নূতন চাটাই পেতে বসাবেন, শরবত দিয়ে আপ্যায়ন করবেন, আপনার ধর্ম বিশ্বাসে যাতে আঘাত না লাগে সেজন্য নূতন হাঁড়িতে ভাত -তরকারি আর দেশি মুরগীর ঝোল রেঁধে পাশে বসে খাওয়াবেন নিজের ঘরের ছেলের মতো। যে আপ্যায়নে কোন আরব নেই, আছে এই বাংলার মেঠো পথের গন্ধই। মিশে দেখলে তবে তো সেই গন্ধ পাবেন! চর্চা করলে তো জানতে পারবেন সখিনা বুবুর সংসার টানার কাহিনী,হাস পালা আর নক্সি কাঁথা তোলার গল্প!

চর্চা নেই,তাই ভুল ধারণার প্রচলন বেশি। যেটুকু জানা তাও ভুলে ভরা! আমার বিশ্বাস যাই হোক,আমি আস্তিক হই বা নাস্তিক, চর্চায় কিসের ভেদ? চর্চায় জ্ঞান বাড়ে। জ্ঞানে বিদ্বেষ দূর হয়, মানুষ মানুষের কাছে আসে। তাই চর্চা দরকার! চর্চায় কিসের ছোঁয়াছুত এই সমাজে জানিনা!

এই সমাজে একটা বৃহৎ জাতির প্রতি এই রূপ মনোভাবের কারণ কি সে নিয়েও চর্চার দরকার আজ ও আছে বই কি!

লেখক- মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন (বর্ধমান)

 

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here