উপমহাদেশে মাদ্রাসা-শিক্ষার পত্তন ও ইতিকথা

দারুল উলুম দেওবন্দ ক্যাম্পাস
  সময়টা অষ্টাদশ শতাব্দীর ষাটের দশক। মহাবিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর ইংরেজদের রোষানলের শিকার বিশেষত মুসলিম জাতি। সংগ্রামের নায়ক ও ধারক-বাহক উলামা-সমাজের উপর তখন অত্যাচারের চরম বিভীষিকা। চলছে নির্মম হত্যাযজ্ঞ। মুসলিম-মানসে আর একটা স্পেনের পুনরাবৃত্তি ঘটার আতঙ্ক!

অপর দিকে পূর্বেই লর্ড ম্যাকলের ঘোষণা ছিল, “এমন একটা শিক্ষা ব্যবস্থা আমরা প্রবর্তন করতে চাই, যার মাধ্যমে এখানকার অধিবাসীরা রূপে-রঙে থাকবে ভারতীয়, কিন্তু চিন্তা-চেতনা বিশ্বাসে তারা হবে ব্রিটিশ।” মহাবিদ্রোহ-পরবর্তী সময়ে শহীদ ও গ্রেফতারকৃত পুরুষ অভিভাবকহীন পরিবারগুলির ইংরেজ সরকারের তরফে ভরণপোষণ ও তাদের সন্তানদের ‘শিক্ষাদান’ -এর মাধ্যমে এই ঘোষণার প্রতিফলনও মুসলিম সমাজের উপর পড়তে শুরু হয়েছিল।

লর্ড ম্যাকলের উক্ত পরিকল্পনার উত্তরে সাময়িক ভাবে সশস্ত্র সংগ্রামের রণকৌশল বদলে ৩০ মে ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দ মোতাবেক ১৫ মুহাররম ১২৮৩ হিজরিতে উত্তরপ্রদেশের সাহারানপুর জেলার দেওবন্দ নামক এক অখ্যাত গ্রামের প্রান্তদেশে অধুনা দারুল উলূম দেওবন্দ নামী ইসলামি শিক্ষার আদর্শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে হজরত মাওলানা কাসিম নানোতবি (রহ.) অনুদ্ধত অথচ দৃঢ়কন্ঠে ঘােষণা করলেন, “আমাদের শিক্ষা আন্দোলনের উদ্দেশ্য, এমন প্রজন্ম তৈরি করা যারা জাতি ও বর্ণগত ভাবে হবে ভারতীয় এবং চিন্তা-চেতনা ও আদর্শে হবে খাঁটি মুসলিম।”

উপমহাদেশে সরকারি প্রভাবমুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক ইসলামি শিক্ষা আন্দোলনের সূচনা এভাবেই। তারপর সময় অনেক এগিয়েছে। জেলা, রাজ্য, দেশ, মহাদেশ পেরিয়ে এক দেওবন্দ থেকে হাজারো দেওবন্দ তৈরি হয়েছে এবং নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে তারা সমাজের দ্বীনি প্রয়োজন ও মার্গদর্শনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে  উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে।

তবে ভারতীয় উপমহাদেশে মাদ্রাসা-শিক্ষাব্যবস্থার গোড়াপত্তন এর বহু পূর্বে, ১১৯১ খ্রিস্টাব্দে শিহাবুদ্দীন ঘোরির আজমিরে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। মুসলিম শাসকরা এরপর থেকে বিক্ষিপ্তভাবে কিছু মাদ্রাসাও প্রতিষ্ঠা করে। শিক্ষকদের বেতনও সরকারের পক্ষ থেকে ধার্য হয়। কিন্তু এগুলি খুব বেশি সুবিন্যস্ত ও সুশৃঙ্খল ছিল না।

তের থেকে পনেরো শতকে এসমস্ত মাদ্রাসায় যে ধরনের পাঠ্যক্রম ছিল, পনেরো শতকের শেষের দিকে তাতে বেশ রদবদল হয়। আবার ষোলো শতকের শুরুর দিকে তাতে পুনরায় কিছু পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করা হয়। এই তৃতীয় যুগের পাঠ্যক্রমের বিখ্যাত আলিম শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভি, যিনি এই পাঠ সম্পন্ন করার পরে আরবে গিয়ে আবু তাহির মাদানি (রহ.) -এঁর কাছে হাদীসের সনদ অর্জন করেন ও ফিরে এসে উপমহাদেশে হাদীস পাঠ ও প্রচার-প্রসারের সূচনা করেন। তাঁরই সময়কালে মোল্লা নিজামুদ্দিন (১৬৭৭ – ১৭৪৮ খ্রি.) তাঁর পিতা শায়খ কুতুবুদ্দিন সাহালভি (রহ.) এঁর উদ্ভাবিত পাঠ্যক্রমকে পরিমার্জিত আকারে পেশ করলে তা সর্বজনের কাছে গৃহীত হয় ও সেটিই দরসে নিজামী পাঠ্যক্রম রূপে খ্যাতি লাভ করে এবং সমস্ত মাদ্রাসার সিলেবাসে তা অন্তর্ভুক্ত হয়। প্রখ্যাত আলিমে দ্বীন আব্দুল হাই হাসানি নাদভি (রহ.) উপমহাদেশের দ্বীনি পাঠ্যক্রমকে মূলত চারটি যুগে এভাবেই ভাগ করেছেন।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, দ্বীনি পাঠ্যক্রম নির্দিষ্ট থাকলেও দারুল উলূম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার পূর্বে তার প্রয়োগ সুবিন্যস্ত ছিল না। এমনকি দেওবন্দেও শুরুর কয়েক যুগে শ্রেণিবিন্যাস বাধ্যতামূলক ছিল না। ছাত্ররা নিজের ইচ্ছামতো বিষয় ও বই বাছাই করে নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট শিক্ষকের দরসে উপস্থিত হতো। তবে প্রত্যেক ছাত্রকে স্বেচ্ছায় বাছাই করা প্রত্যেকটি বিষয়ের পরীক্ষা দিতে হতো। পরবর্তীতে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয়ে দেওবন্দে শ্রেণিবিন্যাস বাধ্যতামূলক করে দেওয়া হয়। প্রয়োজনবশত দরসে নিজামীর মূল কাঠামোকে অক্ষুন্ন রেখে কিছু বিষয় ও বই-পত্রের সংযোজন বিয়োজন করা হয়। এই মুহূর্তে উপমহাদেশের অধিকাংশ মাদ্রাসা দেওবন্দের সিলেবাস ফলো করে চলে।

দারুল উলুম দেওবন্দ

মাদ্রাসা-সিলেবাসের সংক্ষিপ্ত পরিচয়

বর্তমানে মূল আট বছরের এই পাঠ্যক্রমে তাফসীর, হাদীস, ফিকহ্ বা ইসলামি আইনশাস্ত্র, এই তিনটির মূলনীতি ও আকাইদের উপর লিখিত সর্বমোট ২৬ টি গ্রন্থ ছাড়াও [এক্ষেত্রে কয়েকটি খন্ডে রচিত ও একাধিক শ্রেণিতে পঠিত গ্রন্থকে একটিই গ্রন্থ ধরা হয়েছে, যেমন ফিকহ্ শাস্ত্রের “হিদায়া,” ৪ খণ্ড, ৩ বছর ধরে পড়ানো হয়। মিশকাত শরিফ ৩ ভাগে ভাগ করে পড়ানো হয়, জালালাইন শরিফ, বুখারী শরিফ, মুসলিম শরিফ, তিরমিজী শরিফ, আবু দাঊদ শরিফ, এগুলি সব একাধিক ভাগে ভাগ করে পড়ানো হয়। এগুলিকে একটিই গ্রন্থ ধর্তব্য করা হয়েছে। এবং এই সমস্ত গ্রন্থের একটি পৃষ্ঠার আকার A4 পৃষ্ঠার দ্বিগুণ।] আরবি ভাষা, সাহিত্য ও অলঙ্কার শাস্ত্রের ১১ টি,  যুক্তিশাস্ত্রের ৫ টি, দর্শনশাস্ত্রের ২ টি, ইসলামি উত্তরাধিকার হিসাবের ১ টি এবং ইতিহাসের উপর ৫টি, সর্বমোট অৰ্ধ শতাধিক বই পড়ানো হয়।

পরিপূর্ণ এই সিলেবাসটি এমনভাবে তৈরি যাতে ছাত্রদের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটে ও তাদের মধ্যে উদ্ভাবনী দক্ষতার সৃষ্টি হয়। সেজন্য এগুলো বুঝতে মেধাবী ছাত্রদেরকেও বেশ বেগ পেতে হয়। বিশেষত যুক্তি ও দর্শন শাস্ত্রের বইগুলি অনেক মেধা, একাগ্রতা ও শ্রমের দাবি রাখে। শুধু তাই নয়, আকিদা ও ফিকহ্ শাস্ত্রে শরয়ী দলিলের সাথে সাথে এই সমস্ত যুক্তি ও দর্শনের মাধ্যমেও সংশ্লিষ্ট বিষয়টিকে প্রমাণ করা হয়।

অনেকেই মাদ্রাসা সিলেবাসের সংস্করণের কথা বলে, তাতে আধুনিক শিক্ষার বেশ কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি রাখেন। তাঁদের উদ্দেশে প্রশ্ন যে, উপরে বর্ণিত পাঠ্যক্রমে আরও কিছু বিষয় যুক্ত করা সম্ভব কি? বিপরীত দিক দিয়ে ভাবলে তাহলে তো একজন মেডিক্যাল বা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্রকে একই সময়ে কুরআন হিফজ করতে বলতে হয়! তাফসীর, উসূলে তাফসীর, হাদীস, উসূলে হাদীস, ফিকহ্, উসূলে ফিকহ্ ইত্যাদি বিষয়গুলিও তার পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করতে হয়! নিজের জায়গায় এসব বিষয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা অনস্বীকার্য। কিন্তু একজন ছাত্রের পক্ষে এত কিছু ‘একসাথে’ শেখা কোনও ভাবেই সম্ভব নয়। তবে  হ্যাঁ, স্বতন্ত্রভাবে, আলিম কোর্স কমপ্লিট করার পরে সে অনেক কিছুই শিখতে পারে, জানতে পারে। আর এটা হচ্ছেও। একটু লক্ষ করলে এমন উদাহরণ সমাজে আমরা অনেক দেখতে পাব। যাঁরা এমন পরামর্শ দেন তাঁদের উদ্দেশ্য হয়তো সৎ, কিন্তু তাঁরা আসলে মাদ্রাসার সিলেবাস সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন।

একজন আলিম একটি নির্দিষ্ট বিষয় বা দিক নিয়ে পড়াশোনা করে, পরবর্তীতে সেটিই তার ফিল্ড ও ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র, আলোর গতি, মহাকর্ষীয় ধ্রুবকের মান বা কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের তথ্য তাঁর জানা না থাকলে কী প্রভূত ক্ষতি হয়ে যাবে? সমাজের সাথে ওঠাবসা করতে গেলে, আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত সমাজের কাছে দ্বীনের সঠিক ছবিটা তুলে ধরতে গেলে কিছু ভাষাগত ও সামাজিক জ্ঞান থাকা চাই, ব্যস। এর বাইরে তাঁকে একাধারে আলিমও হতে হবে আবার বিজ্ঞান, ইতিহাসের পণ্ডিত বা যোগ্য ভূগোলবিদ হতে হবে, এমন চাওয়াগুলো একটু বাড়াবাড়ি বই কি!

ব্যাপারটা অনেকটা এমন, একজন ডাক্তারকে একাধারে ডাক্তার হওয়ার সাথে সাথে একজন কুরআনের হাফিজ হতে হবে! একজন আইনবিদকে আইনজ্ঞ হওয়ার সাথে সাথে আরবি সাহিত্যিকও হতে হবে! একজন বাংলা সাহিত্যিককে সাহিত্যে পারদর্শী হওয়ার পাশাপাশি তাফসীর বা হাদীস শাস্ত্রেও দক্ষ হতে হবে! আধুনিক শিক্ষার ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিষয়কেন্দ্রিক বিভাগগুলোর যে বিভাজন তার সাথে তো আমরা সবাই একমত। অর্থাৎ একজন মেডিক্যাল সায়েন্সের ছাত্রের কাছে তো অর্থনীতির মার্জিনাল রিভিনিউ ও কস্টের নিখুঁত ডায়াগ্রাম বা এক্সপ্লিসিট, ইমপ্লিসিট কস্টের সংজ্ঞা বা ব্যাখ্যা আমরা কখনই জানতে চাই না। অনুরূপ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কোনও ছাত্রের কাছে ফার্ডিন্যান্ড ম্যাগেলানের বিষয়ে তথ্যসমৃদ্ধ আর্টিকেলের আশাও আমরা করি না।

বোঝা গেল, ব্যতিক্রমী ব্যতীত একজন ব্যক্তি একাধারে একাডেমিক্যালি কয়েকটি বিষয়ের পণ্ডিত হতে পারে না, এটা আমাদের সকলের বিশ্বাস।  কিন্তু মাদ্রাসায় একটি দীর্ঘ সময় পরিপূর্ণ নজরদারিতে থেকে ও অধ্যবসায়ে অতিবাহিত করে ও একটি নির্দিষ্ট পাঠ্যক্রম শেষ করে যারা একাডেমিক ভাবে যোগ্য আলিম, মুফতী তৈরি হচ্ছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে আমাদের এই বিশ্বাসে কোথাও যেন নোনা লেগে যায়! আমাদের দাবি থাকে, ওই সমস্ত আলিম বা মুফতীদের অবশ্যই একাধারে ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞানে রীতিমতো পারদর্শী হওয়া উচিত। এর সম্ভাব্য কারণ নিচে উল্লেখিত দু’টি কারণের মধ্যে যে কোনও একটি হতে পারে। এক. মাদ্রাসায় পাঠ্য দ্বীনি শিক্ষাকে আমরা একাডেমিক পার্টিকুলার শিক্ষাব্যবস্থা ভাবার মানসিকতা রাখি না। দুই. বাস্তবে মাদ্রাসা পড়ুয়া যে সমস্ত স্কলারদের আমরা দেখি, তাত্ত্বিক বিষয়েও তাদের এক বড়ো অংশের অযোগ্যতা ও সামাজিক বিভিন্ন আচরণে আমরা বীতশ্রদ্ধ হয়ে পুরো শিক্ষাব্যবস্থার উপযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলি ও পরিবর্তে তাদের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার তাকিদ করি।

তবে আলিম-সমাজের পক্ষ থেকে সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তিদের ইসলামের মৌলিক ও প্রাথমিক বিষয়াদি সম্পর্কে অবহিত হওয়ার বিষয়ে যেমন তাকিদ করা হয়, ঠিক এমনই তাকিদ বা দাবি আমরা আলিম সমাজের জন্যও করতে পারি যে, তাঁরাও যেন সামাজিক ও ভাষাগত জ্ঞান অর্জনে সচেষ্ট হন। সোজা কথায়, প্রত্যেক আলিমকে মাতৃভাষায় এতটা দক্ষ হওয়া উচিত, যাতে তিনি সমাজের সব স্তরের মানুষকে যে কোনও জায়গায় দাঁড়িয়ে দ্বীনের ছোটো-বড়ো, মৌলিক-শাখাগত সব বিষয়গুলিই অবলীলায় বুঝিয়ে দিতে পারেন এবং সমাজ সম্পর্কে, সমাজে বসবাসকারীদের কার্যক্রম ও তাদের মন-মানসিকতা সম্পর্কেও তিনি যেন অবশ্যই অবগত থাকেন।

 মাদ্রাসা-সিলেবাসে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের পরিমাপ

পশ্চিমবাংলার সমাজ, ভাষা ও সমাজের প্রয়োজনীয়তার দিকে লক্ষ করে এখানকার মাদ্রাসার পাঠ্যক্রমে মূল কাঠামোকে অক্ষুন্ন রেখে সামান্য কিছু হেরফের করা উচিত।

যেটা বাংলাদেশ ১৫/২০ বছর আগে করেছে এবং আশাতীত ভাবে সফল হয়েছে। সেখানকার মাদ্রাসাগুলিতে বর্তমানে মাতৃভাষাতেই পড়ানো হয়। আরবি-বাংলা ও বাংলা-আরবির কম্বিনেশন। ফলস্বরূপ সেখানকার ছাত্ররা দু’টি ভাষাতেই বেশ দক্ষ হয়ে ওঠে।

আর আমাদের পশ্চিমবঙ্গে আরবি, উর্দু, বাংলা, একসাথে তিনটে ভাষাকে মিলিয়ে খিচুড়ি বানিয়ে দেওয়া হয়। ছাত্রদের পক্ষে কোনও একটি ভাষাও আয়ত্তে আনা সম্ভব হয় না। উর্দুর প্রয়োজন অস্বীকার করার কোনও জায়গা নেই। আরবির পরে এই মুহূর্তে ইসলামি স্কলার, গবেষক ও বিদগ্ধ লেখকদের মূল্যবান বইপত্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম সম্ভার উর্দুতে। তাই উর্দু না জানা মানে সেগুলো থেকে বঞ্চিত হওয়া। তবে কী, উর্দু ভাষাটা এতই সহজ ও আরবির সাথে এতটাই ওতপ্রোতভাবে জড়িত যে, একজন আরবি পড়ুয়া ছাত্র মাত্র কয়েকদিনের চেষ্টায় তা আয়ত্ত করে নেবে। সাথে সাথে উর্দুকে একটা স্বতন্ত্র ভাষা হিসাবে শেখানোও যেতে পারে। মোটকথা আরবি ও মাতৃভাষা এই দু’টি-র উপর আমাদের মাদ্রাসা ছাত্রদের অনেকটাই দুর্বলতা। আর এই দুর্বলতার কারণেই তারা ইসলামি শিক্ষা ও সামাজিক ক্ষেত্র, দু’ জায়গাতেই পিছিয়ে পড়ছে। সেটাকে কাটাতে গেলে আমাদের বাংলাদেশের দেখানো ফর্মুলা প্রয়োগ করতে হবে।

কেননা শিক্ষাকে সমাজোপযোগী করে না তুলতে পারলে সেই শিক্ষা থেকে সমাজ কি ভাবে উপকৃত হবে?

বিশেষত যখন এটা ইসলামি শিক্ষা। যার প্রধান উদ্দেশ্য হলো, তার সমস্ত বিধি-বিধানকে জেনে নিজে তা মান্য করা এবং অপরের কাছে সঠিক বিষয়টি পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি অর্জন করা। কুরআন এবং হাদীসের আলোকে একজন আলিমের জন্য এই দু’টি জিনিস একেবারে অপরিহার্য। কুরআনের ভাষ্যমতে :

  اتأمرون الناس بالبر وتنسون أنفسكم وأنتم تتلون الكتاب

অর্থ : তোমরা কি মানুষকে সৎকর্মের নির্দেশ দাও এবং নিজেরা নিজেদের ভুলে যাও, অথচ তোমরা কিতাব পাঠ করো! [সূরা বাকারা : ৪৪] দ্বিতীয় বিষয়টি প্রিয় নবী (স.) -এঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে بلغوا عني ولو آية রূপে। অর্থাৎ : আমার পক্ষ হতে প্রাপ্ত সবকিছুই অপরের কাছে পৌঁছে দাও, যদিও তা কিঞ্চিৎ পরিমাণ হয়। [সহিহ বুখারী : ৩৪৬১]

একজন আলিম যদি মাদ্রাসায় জীবনের প্রথম ২০ বছর ছাত্র রূপে আর পরের ৪০ বছর শিক্ষক রূপে কাটিয়ে অনেক যোগ্য ছাত্র তৈরি করেন, তবে নিঃসন্দেহে এটা অনেক বড়ো সওয়াবে জারির কাজ। সেই সমস্ত ছাত্রদের একটি বড়ো অংশও পরবর্তীতে এই মিশনটিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে আবার একাংশ সমাজের দ্বীনি চাহিদা পূরণ করবে। কিন্তু দিন শেষে ইসলামকে শুধু মাদ্রাসার চার দেওয়ালের মাঝেই আবদ্ধ করে রাখা হলো না তো?

প্রত্যক্ষ ভাবে একজন আলিমের কাছে সমাজের কি কোনও দাবি নেই? মাদ্রাসার একটা গুরুত্বপূর্ণ মিশন বা লক্ষ্য হলো, কুরআন-হাদীস তথা পরিপূর্ণ দ্বীনকে সংরক্ষিত রাখা ও যে কোনও প্রকার বিকৃতি থেকে সেগুলিকে বাঁচানো। সে দিকে দেখলে শিক্ষকদের একটি অংশকে শুধুমাত্র পড়া, পড়ানো, লেখালেখি ইত্যাদি বিষয়ে পরিপূর্ণ একাগ্রতার সাথে আত্মনিয়োগ করা উচিত। উপরোক্ত শ্রেণি ছাড়া অন্যান্য শিক্ষকদের সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ হওয়া উচিত। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের পাবন্দির বিষয়কে মাথায় রেখেও বলা যায় যে, ইচ্ছা থাকলেই তাঁরা গ্রামে বা এলাকায় দ্বীনি চেতনা জাগাতে ও দ্বীনি চাহিদা মেটাতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারেন। জলসার দাওয়াতে তাঁরা যেমন ‘ইচ্ছা’ নিয়ে অংশগ্রহণ করেন ও সারারাত না ঘুমিয়েও পরদিন ক্লাস জয়েন করেন, আশা করা যায় তার সিকিভাগ ‘ইচ্ছা’-ও এলাকায় দ্বীনি কাজ করার সুযোগ এনে দেবে।

একজন যোগ্যতাপূর্ণ আলিম বা মুফতী ভিনরাজ্যের অথবা দূরবর্তী কোনও জেলার মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন। মাসে ২ দিনের জন্য অথবা ৬ মাস অন্তর কয়েকদিনের জন্য গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে আসেন। এটাই তাঁর জীবন? এর বাইরে কি তাঁর আর কোনও ভাবনা নেই? দায় নেই? দায়িত্ব নেই?

তাঁর গ্রামের মক্তবটা ঠিকঠাক চলছে না। সেখানকার পরিকাঠামো ঠিক নেই। সেখানে একটি ভালো শিক্ষকের প্রয়োজন। এলাকার শিশুদের প্রাথমিক মৌলিক দ্বীনি শিক্ষা দেওয়ার কোনও আগ্রহ তাদের অভিভাবকদের নেই। তাদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির প্রয়োজন। এগুলি কি একজন আলিমের কাজ নয়?

উপযুক্ত কোনও কারণ ছাড়াই আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিতদের তিনি সযত্নে এড়িয়ে চলেন। তাদের নিকটবর্তী হয়ে দ্বীনকে বোঝানোর কোনও গরজ কি তাঁর নেই? বয়স্করা কুরআন শিখতে আগ্রহী, কিন্তু কোনও পরিকাঠামো, কোনও সুযোগ কিছুই নেই। সেগুলো তৈরির দায়ও কি তিনি পুরোপুরি এড়িয়ে যেতে পারেন?

তবে এর অর্থ এই নয় যে, মাদ্রাসার শিক্ষক একজন আলিমকে হাদীস,কুরআনের দরস দেওয়া ছেড়ে এসব সামাজিক খিদমতে আত্মনিয়োগ করতে হবে। আরও একবার স্মরণ করিয়ে দিই, দ্বীনের সহীহ ভাবমূর্তিকে অক্ষুন্ন রাখতে মাদ্রাসার কোনও বিকল্প নেই। তাই এর প্রতি প্রত্যেক আলিমের ভালবাসাটাও অসীম। সেখানে শিক্ষকতা করতে পারাটাও সৌভাগ্য ও গর্বের সূচক। কিন্তু এর জন্য একজন আলিম তাঁর পাড়া, তাঁর গ্রাম, তাঁর এলাকা ও সর্বোপরি সমাজের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতাকে সম্পূর্ণরূপে এড়িয়ে যেতে পারেন না।

সারকথা হলো, সমাজের খিদমত ও তাদের মধ্যে দ্বীনি অনুভূতি জাগ্রত করার দায়িত্ব একজন আলিমের জন্য অবিচ্ছেদ্য একটি বিষয়। যে সমস্ত আলিম স্বাধীন হয়েও এই কাজগুলো করেন না, সমাজের সাথে সম্পর্ক রাখেন না, তাঁদের প্রতি বিনীত অনুরোধ, তাঁরা এই পরিস্থিতির পরিবর্তন করুন। আর এই পরিবর্তনটা নিজের থেকেই শুরু করুন। মনে রাখবেন, আল্লাহ আপনাকে অনেক বড়ো নিয়ামত প্রদান করেছেন, যার কিঞ্চিৎ পরিমাণ শুকরিয়া আপনি এভাবেই আদায় করতে পারেন।

এবার একটু ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখা যাক। উপরে বর্ণিত সামাজিক খিদমতসমূহের সুযোগটাই যদি কোনও আলিম না পান? বা তাকে যদি সেই সুযোগটা না দেওয়া হয়? তখন এর সমাধান কি?

লেখক- মনজুর আলম (দারুল উলুম দেওবন্দের 2019-20 বর্ষের ইসলামী আইনশাস্ত্র ও আইন এর ছাত্র)। 

2 COMMENTS

  1. লেখাটা পড়লাম । সব কিছু যে খুব প্রাঞ্জল হল তা নয় । আবার পড়বো লেখাটা । তবে একটা ব্যাপার খুব স্পষ্ট হলনা লেখাটা থেকে , সেটা বিজ্ঞান বিষয়টা । মাদ্রাসা শিক্ষায় বিজ্ঞান বিষয়টা কোন স্তর থেকে শুরু হবে ? আধুনিক যুগে বিজ্ঞান বিষয়টার প্রাথমিক ধারনাটা প্রত্যেক ছাত্রেরই থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন । আজকাল তো সমস্ত জায়গায় কম্পিউটারের জ্ঞান দরকার হয় । সে ব্যাঙ্কের এটিএম থেকে টাকা তোলা বা জমা দেওয়াই হোক বা অনলাইনে ইলেক্ট্রিক বিল , ট্যাক্স , রেল বিমানের টিকিট কাটা , এমনকি সিনেমা থিয়েটারের টিকিট কাটা , মায় , ট্যাক্সি ডাকা ডাকি তেও কম্পিউটারের জ্ঞান একান্ত প্রয়োজন । সেক্ষেত্রে বিজ্ঞান বিষয়টা প্রথম থেকেই না শিখলে পদে পদে ঠকে যাওয়া , এমনকি প্রতারনার শিকারও হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায় ।
    একজন ছাত্রের উপর জোর করে তিনটে ভাষা – বাংলা , উর্দু ও আরবি চাপিয়ে দেওয়ার বিষয়টা পড়তে পড়তে আমার নিজের স্কুলজীবনটা মনে পড়ল । পঞ্চম শ্রেণী থেকে দু বছর জবরদস্তি হিন্দি শেখানো হয়েছে আমাদের । তারপর , সপ্তম শ্রেণী থেকে দু বছর জবরদস্তি সংস্কৃত শেখানো হয়েছে । ইংরেজি তো সেই দ্বিতীয় শ্রেণী থেকেই আছে । আর বাংলা তো মাতৃভাষা , শিখতে হবেই । শুনতাম আমাদের শিক্ষা নাকি ত্রিভাষা সূত্র ধরে । কিন্তু আসলে তো চার চারটি ভাষা আমাদের উপর অমানবিকভাবে চাপানো হয়েছিল । আসলে সবই হচ্ছে হিন্দি সাম্রাজ্যবাদের চক্রান্ত – হিন্দিভাষীরা শিখবে মাত্র দুটি ভাষাই – হিন্দি আর ইংরেজি । বাকিভারত চার চারটে ভাষার জোয়াল কাঁধে হাঁফিয়ে মরুক !
    মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্হা নিয়ে আমাদের একেবারেই অজ্ঞানতার কারনে কিছু কিছু বোঝার ভুল হতে পারে । সে ক্ষেত্রে পরের কিস্তিতে কিছু থাকলে বুঝতে হয়তো সুবিধা হবে ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here