জীবে প্রেম করে যেই জন…

সপ্তর্ষি বৈশ্য, আইটি সেক্টরের কর্মী। সারা সপ্তাহ প্রচণ্ড পরিশ্রমের পরে স্বচ্ছন্দে উইক এণ্ড কোনও ডিস্কো  বা পাবে উদ্দাম জীবন কাটাতেই পারতেন। এখনো ছাব্বিশ বছর না হওয়া টগবগে তরুণ সেসব না করে প্রতিটি উইক এণ্ড সেলিব্রেট করেন পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষের সাথে। সপ্তর্ষির কাছে গ্রামের সমস্ত পরিবারই তার এক্সটেনডেড ফ্যামিলি। বিরহড়দের নিয়ে সপ্তর্ষি এবং তার টিম নতুন স্বপ্ন দেখছেন। স্বপ্ন দেখাচ্ছেন এক নতুন পৃথিবীর। “জীবনের পাঠশালা” তে আসুন আমরাও ভাগ করে নিই সপ্তর্ষির স্বপ্ন

  •    সপ্তর্ষি আপনার ছোটবেলা সম্পর্কে কিছু বলুন

এটা বলতে গেলে অনেকটা পিছনে গিয়ে অনেককিছু বলতে হবে।
সপ্তর্ষি বৈশ্য
আমার জন্ম ১৯৯৬ সালের ২৩শে জানুয়ারি। আমার বাবার জন্ম ভাড়া বাড়িতে, আমার জন্মও ভাড়া বাড়িতে। আমার দাদু বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলার মানুষ, সেই সূত্রে আমারও শিকড় বাংলাদেশের। এদেশে আসার পর যাযাবরের মত এর বাড়ি ওর বাড়িতে কেটেছে। দীর্ঘ ৫৪ বছর ধরে বাড়ি পাল্টে গেছে আমার পরিবার। আমার মা গর্ভ ধারন করেন এক বাড়িতে, আমি জন্মাই আর এক বাড়িতে, স্কুলে ভর্তি হই আর এক বাড়িতে, ক্লাস ফাইভে উঠি আর এক বাড়িতে, প্রথম প্রেমে পড়ি আর এক বাড়িতে, সেই প্রেম ভাঙে আর এক বাড়িতে। চারপাশে পরিবেশ মানুষ সব কিছু বদলাতে থাকে বারবার। এক বাড়ির বাড়িওয়ালা ডেকে চাউমিন খাওয়াতেন তো আর এক বাড়িওয়ালা বাবা দুমাস ভাড়া দিতে না পারলে শুয়োরের বাচ্চা বলতেন। কাজেই মানুষ দেখার ফ্রেম পাল্টে যেত বারবার। ছোট থেকেই জীবনটা ট্রেনের জানলার মত, আমি বসে আছি এক জায়গায়, দৃশ্যপট পাল্টে যাচ্ছে।
 আমার স্কুলজীবন কেটেছে উত্তরপাড়া বালী তে, আমার কলেজ লিলুয়ায়। যখন মাধ্যমিক দিই, বাবা লোন নিয়ে ছোট ফ্ল্যাট কেনে, ফ্রেম পাল্টানো থেমে যায়। কিন্তু ছোট থেকে আমি শুধু বিভিন্ন মানুষের রেঞ্জ দেখে গেছি, কী করে থেমে যাই? একদিকে সেই খিদে, আর একদিকে জীবনে ঢুকছে সুমনের গান। ক্লাস টেন পাশ করার পর থেকে লোকটার গান আনায় তাড়া করতে থাকে। যে ধাক্কাটা অন্য কেউ দেয়নি তা সুমনের গান দিয়েছিল।
বন্ধু ও সহকর্মীদের সাথে
  আমি আছড়ে পড়লাম রাস্তায়। আমার শখ মানুষ দেখা, তাদের সাথে মেশা। আমার ছোটবেলার এক খুব কাছের বন্ধু আদিত্য (অধিকারী), প্রথম সিগারেট টানা ওর সাথেই, প্রথম বাড়ি ছেড়ে পালানো ওর সাথে, জীবনের প্রথম অনেককিছু ওর সাথে। ও এখনও নিজের মত থাকে, দিব্যি থাকে। ওর সাথে বেরিয়ে পড়া কলকাতার রাস্তাঘাটে, এই বাস ওই বাস ধরে এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় যাওয়া। সুমনের গানের সাথে যে মানুষগুলোকে কানেক্ট করতে পারতাম তাদের সাথে খুব মিশতাম, কখনও ফুটপাতের মানুষ, কখনও রিক্সাওয়ালা, কখনও কন্ডাক্টার, হিজড়ে সব রকম।
    একবার এক বাচ্চা রিক্সাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম “ঘুড়ি উড়িয়েছ কখনও?”, সে কী মনে করে রিক্সা থামিয়ে আমার সাথে গল্প করতে লেগেছিল, বেশ ভাল বন্ধুত্ব হয়েছিল। ওই যে “যে ছেলেটা প্রানপনে রিক্সা চালাচ্ছে মুক্তির ঘুড়ি তাকে খবর পাঠাচ্ছে” সেখান থেকে কানেক্ট করেছিলাম। তারপর আর একটা বন্ধুদের গ্রুপ ছিল, ছোটবেলার স্কুলের বন্ধু, অর্কেন্দু, অনিকেত, কৌস্তভ, অভিরূপ, বিশ্বরূপ, অমিত আমরা বসে আড্ডা মারতাম ফি রবিবার কারোর বাড়িতে, টোয়েন্টি নাইন প্রিয় ছিল।
  •  ফেসবুকে সকলে টাইম পাস আর স্ট্রেস বার্স্ট করতে আসেন। সেই সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে মানুষের কল্যাণ করার কথা কিভাবে মাথায় এলো?

    প্রথমত ফেসবুক আমার কাছে একটা প্ল্যাটফর্ম। প্রচুর মেয়ে যেমন ক্রাশ খায় তেমন কাজের মানুষও আসেন। ক্রাশ খাওয়াটা হাল্কা ভাবে এঞ্জয় করি, কিন্তু এই ক্রাশ ফ্রাশ দু চারদিনের বেশি টেকেনা, কারন রিপ্লাই দিয়ে উঠতে পারিনা মাসের পর মাস। কিন্তু ঠিক এই ফেবু থেকেই একদিনে ১০৩ জন ব্লাড ডোনার পেয়ে  ইনহাউস ক্যাম্প করেছি প্রথম, তারপর তা ধারাবাহিক। এই ফেবু থেকেই অভিষিক্তার জন্য তিনদিনে প্রায় তিন লক্ষ টাকা তুলে এমার্জেন্সি সার্জারি সম্ভব হয়েছে। এই ফেবু এর জন্যই নিজের পাড়া থেকে উদ্ধার হওয়া গঙ্গায় ভেসে আসা কুকুর ৫ ঘন্টায় তার মালিকের কাছে ফিরে গেছে। এই ফেবু এর জন্য কত ব্লাড ডোনরকে পেয়েছি। এই ফেবু না থাকলে এত মানুষকে পেতাম না।
  এবার কাজ কীভাবে শুরু হল সেটা আগের প্রশ্নের রেশ ধরে বলি, সেই টোয়েন্টি নাইন তাসের আসর,
সেইখান থেকেই এক শীতকালে বসে আড্ডা দিতে দিতে মানুষের কথা হতে হতে ঠিক করি আমার বালী বেলুড় এলাকার ফুটপাথে যারা শুয়ে থাকেন তাঁদের শীতে কাঁপতে দেখেছি, তাঁদের যদি কিছু দেওয়া যায়!
  সেকেন্ড ইয়ার তখন। সবে ফেবু এ এসছি, লিখলাম তখন। ভাবতে পারিনি কুড়িহাজার টাকা উঠতে পারে ৭ দিনে, ওই প্রথম ক্রাউড ফান্ডিং করে শীতের রাতে একশোর ওপর কম্বল নিয়ে রাতে নীরবে মানুষগুলোর গায়ে চাপিয়ে রেখে আসি। তখন আবেগ বেশি স্বাভাবিক ভাবেই, যেমনটা হয়। এরপর নাটক দেখতে গিয়ে জড়িয়ে পড়ি একটা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সাথে।
  আমাদের সবার মধ্যেই ভাল করার একটা সুপ্ত ইচ্ছে থাকেই, মানুষ রাস্তা খোঁজে। আমার কাছে মনে হয়েছিল ওই সংস্থার মাধ্যমে যদি কিছু করা যায়, কিছুদিন থাকার পর আস্তে আস্তে আবেগ কমলো, যুক্তি দিয়ে কিছু  জিনিস বিচার করে দেখলাম আমি যা চাইছি তা হচ্ছেনা, মতবিরোধ হয় এবং আমি সরে আসি। সরে আসার আগে থেকে কলেজের বন্ধুবান্ধব, ফেবু এর নব্য পরিচিত বন্ধুদের নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরতে থাকি, ঋতুকালীন স্বাস্থ্যসচেতনতার ওপর ক্যাম্পেইন করতে থাকি, ভাল সাড়া মেলে।
আদিবাসী শিশুদের সাথে কাটানো সময়
  এরসাথে নিজের প্যাশন ছবি তোলা। টিউশন করে বছর তিনেক সঞ্চয় করে আর সেমেস্টারের টাকা ব্যাঙ্কে কিছুদিনের জন্য ফিক্স করে সুদ তুলে নিজের খরচ চালাতাম আর বাকিটা জমাতাম, খরচ কিছু নেই আমার, বিড়ি সিগারেট অবধি খাইনা, কলেজও স্থানীয় এলাকায়। কাজেই পয়সা জমতে লাগল, জমিয়ে একটা ক্যামেরা কিনেছিলাম, শখ ছিল ছবি তোলার, নিমাই ঘোষ যেমন ট্যাক্সি থেকে ক্যামেরা কুড়িয়ে পেয়ে ছবি তুলতে শুরু করেন, আমার ক্ষেত্রে তা ছিল প্রথম আদিত্যর ক্যামেরা। যাইহোক নিজে ক্যামেরা নিয়ে বেড়িয়ে পড়ি রাস্তাঘাটে। এতদিন যে মানুষগুলোর সাথে মিশছি, চিনছি দেখছি তা ফ্রেমে ধরতে শুরু করলাম, বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন এক্সপ্রেশন ক্যাপচার করতাম, রাস্তার ছবি তুলতাম।
 ম্যাগাজিনে সুন্দরী মেয়েদের ছবি দেখতাম কিন্তু মডেল শ্যুটের কথা মনে হয়নি কখনও, কত দারিদ্রতার মধ্যে থাকা সুখী মুখ আমার চোখের সামনে জীবন্ত মডেল। জীবনে একবার রবীন্দ্রভারতীর বসন্ত উৎসবে গেছি, একবার বাগবাজারে সিঁদুর খেলা, মেয়েদের ছবি তুলতে, গিয়ে মনে হয়েছে এ ছবি তোলা হয়ে গেছে আমার দরকার নেই। আর ওমুখো হইনি। একদিকে ঠাকুর ভাসান হচ্ছে, আমি টেরিটিবাজারের চিনে পট্টিতে ফুটপাথের বাচ্চাদের সাথে তখন সময় কাটিয়েছি। আর কাটিয়েছি সুমনের অনুষ্ঠানে। হেন কোন সুমনের অনুষ্ঠান বাদ ছিলনা যেখানে আমি যাইনি, এই লোকটার গান লোকটার কথা শোষন করতাম নিজের ভেতরে। লোকের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আগ্রহ নেই কোন, আমি সুমনের গানে বাঁচি।  এভাবে কেটে গেছে কলেজ অব্ধি।

 তারপর হঠাৎ কলেজ থেকে চাকরি পেলাম, ক্যাম্পাসিং এ বসিনি, একটা পরীক্ষা দিয়ে চাকরি পেয়ে যাই। খাতায় কলমে আনি আর আমার এক বান্ধবীকে দিয়ে আমাদের ব্যাচে চাকরি পাওয়ার খাতা খোলে। আমি আর আদিত্য এক কাপড়ে শঙ্করপুর পালিয়েছিলাম, দুপুর ১২টায় ঠিক করে বিকেল ৩টের বাস ধরে হাওয়া। বাসে যেতে যেতে জয়নিং লেটার আসে, ১৫ দিন পর জয়নিং। তারপর একছুটে গুজরাত, মন বসতনা ওখানে। আড়াইমাস কাটিয়ে পোস্টিং পাই কলকাতায়, আনন্দে আত্মহারা হয়ে কাউকে না জানিয়ে রাতের ফ্লাইট ধরে সোজা কলকাতা। বাবা প্রথমে ভেবেছিল অফিসে কিছু গন্ডগোল করেছি তাই বের করে দিয়েছে। তারপর কর্মজীবন আর অন্য কাজকরা সমানভাবে চলতে লাগল। অভিরূপ আমার ভাই, ওকে ব্লাড ক্যান্সারে হারিয়ে ফেলি, কান্না চেপে নিজের হাতে ডেথ সার্টিফিকেট নেওয়া, চুল্লি অবধি নিয়ে যাওয়া সব আমাকেই করত হয়। জীবন শিখিয়ে দেয় কীভাবে শক্ত হতে হয়। তারপর বাৎসরিক ক্রিয়াকর্ম বাদ দিয়ে ওর মৃত্যুদিনে রক্তদান শিবির করা শুরু করি, যেহেতু রক্তের অভাবে ওকে হারাই, তাইবার কিছু অভিরূপ যাতে অন্তত প্রানে বাঁচে সেই জায়গা থেকে রক্তদান শুরু।

রক্তদানের এক মুহূর্তে
   সরাসরি যোগাযোগ করি সেই এন আর এস ব্লাড ব্যাঙ্কে, যেখানে হেমাটোলজিতে অভিরূপ মারা যায়। নেট থেকে নম্বর বের করে ডিরেক্টরকে জানাই সবটা, একদিনের ফেসবুক পোস্ট থেকে সেদিন ১৯ জন এসে রক্ত দিয়ে যান। ওই শুরু, তারপর থামেনি।
  • এখানে একটু থামাচ্ছি, জানতে কৌতুহল হচ্ছে বিরহড়দের কাজটা শুরু করলেন কীভাবে?

বিরহড়দের কথা আগে শুধু নামে শুনেছিলাম, যেমন অন্যান্য আদিবাসীদের কথা শুনে থাকি। কিন্তু কখনও ভাবিনি সেভাবে।
 এরপর “স্বপ্নের স্কুলবাড়ি”র কাজ খুব সামনে থেকে দেখতে শুরু করি, একদল আমার মতই ছেলে মেয়ে দৌড়চ্ছে পুরুলিয়ায়, শবরদের জন্য স্কুল গড়ছে। তাদের সাথে মেলামেশা শুরু হয়, খুব কাছের মানুষ হয়ে ওঠে তারা সবাই, একে একে স্বর্ণাভ দা, শোভন দা, অরিজিৎ দা, সায়ন্তিকা দি সবার সাথে আলাপ হয়। আলাপ হয় আয়কর ভবনের ‘সাড়া’র সঞ্জীব বিশ্বাসের সাথে, আলাপ হয় এরকম অনেক মানুষের সাথে। এইখান থেকেই আবার শুনি বিরহড় বলে একটা উপজাতির অস্তিত্বের কথা, শুধু নামটুকু শুনি আর কোন ডিটেইলস নেই।
  জানার তাগিদে নানান ডকুমেন্টস ঘাঁটতে শুরু করি, পড়াশোনা শুরু করি। জানতে পারি আমাদের ভারতে যে মোট ৭৫ আদিম জনজাতি রয়েছে (PVTG) তারমধ্যে পশ্চিমবঙ্গে তিনটি জনজাতি পড়ে, এক পুরুলিয়ার বিরহড় (ঝাড়খন্ডেও কিছু আছে), দুই পঃ মেদিনীপুরের জঙ্গলমহলের লোধা শবর আর উত্তরবঙ্গের টোটো। বিরহড়দের অবস্থা সব থেকে খারাপ।
বিলুপ্তপ্রায় আদিবাসী বিরহড় দের গ্রাম
 পশ্চিমবঙ্গে মাত্র ৪০০ জন বিরহড় মাত্র বেঁচে আছেন। একদিকে চলছে এই পড়াশোনা আর একদিকে এসে ধাক্কাটা মারলেন রবীন্দ্রনাথ, রাশিয়ার চিঠি আমায় নাড়িয়ে দিল। যে আমরা কী করছি! আর একদিকে কান টানলেন সাড়ার সঞ্জীব বিশ্বাস। আমরা আবেগের বশেই মানুষের পাশে দাঁড়াতে চাই, আবেগ ছাড়া কোন কাজ হয়না, কিন্তু কাজটা করার সময় আবেগের থেকে যুক্তির দাম বেশি, আবেগ যুক্তিকে ছাপিয়ে গেলে কাজটা বেশিদিন করা যায়না। আমরা প্রচুর কম্বল দিয়েছি অসহায় মানুষকে, খাবার তুলে দিয়ে এসেছি একদিন গিয়ে, অনেককিছু করেছি, নিজেরা শান্তি পেয়েছি, কিন্তু একটা ড্যামেজও করে ফেলছি খুব সূক্ষভাবে ভেবে দেখলে। রবীন্দ্রনাথ ভাবালেন দান করে কোন জাতির উত্থান সম্ভব নয়। যেকোন কষ্টের বা সমস্যার মূল কারন শিক্ষার অভাব। আমরা দান করে একটা ভাঙা বাড়িকে বাইরে থেকে রঙ করে দিচ্ছি শুধু, ভেতরটা যে কে সেই।
তাদের মুখোমুখি

যতক্ষন একটা মানুষ তার নিজের জিনিসটুকু নিজে অর্জন করতে শিখবেনা ততদিন কোন উন্নতিসাধন সম্ভব নয় শুধু দান করে। তাই ভাল যদি করতেই হয় তো লেগে থাকব, তাদের জীবনটা গড়ব, আমার ১০০০ কম্বলের দায়িত্ব নেওয়ার দরকার নেই, আমি একটা বিরহড় শিশুর দায়িত্ব নেব সারাজীবনের পড়াশোনার, একদিন নিজের কম্বল সে নিজে কিনবে, তাহলে ১০০০ থেকে একটার ভার সে কমিয়ে দিল, রইল ৯৯৯ টা। এভাবে যদি সবাই এগিয়ে আসি একসাথে তাহলে একদিন আমাদের আর কোন কম্বল, জামা নিয়ে ছুটতে হবেনা। ছুটব ততদিন যতদিন তাদের বেড়ে ওঠার সাপোর্ট টা দরকার, একটা জামা বা কম্বল দিয়ে ফিরে আসবনা, যতদিন না সে সেটা কিনতে পারছে তার জন্য লেগে থাকব। এই চিন্তাভাবনা থেকে জড়িয়ে পড়া  বিরহড়দের সাথে। আমি  আর অর্কেন্দু একা পায়ে বেরিয়ে পড়ি পুরুলিয়ার বিভিন্ন ব্লকে বিরহড় ডেরা ঘুরে দেখতে, কোন পরিচিতি নেই কিচ্ছু নেই। একা যেতাম। এভাবে তাদের সাথে হৃদ্যতা গড়ে ওঠে। বলরামপুর বাস স্ট্যান্ড থেকে খুঁজে পাই অমলেশ কুমারের মত একজন মানুষকে, যার সাথে হাত ধরে বলরামপুর বিরহড় ডেরা বেড়সায় কাজ শুরু।

চাষাবাদে সহায়তা করার মুহূর্তে
   তবে হ্যাঁ আমি কোন সমাজসেবী নই, আমার বন্ধুরাও কেউ সমাজসেবী নয়। নিজেদের সমাজসেবী ভাবার স্পর্ধা নেই। আমরা ওই গ্রাম থেকে ৩৫০ কিমি দূরে একটা শহরে বসে থাকা কিছু ছেলেমেয়ে, যারা ওই গ্রামের মানুষগুলোর, যারা আমাদেরই সহনাগরিক, তাদের থেকে বাড়তি সুযোগ সুবিধে পাওয়া ‘প্রিভিলেজড’ মানুষ। যেটা আমি পেয়ে এসছি, সেটা তারা কেন পাবেনা, সেই জায়গা থেকেই একসাথে এগোনোর স্বপ্ন নিয়ে এগোচ্ছি, এটা আমার দায়, এটা আমার কর্তব্য। আমি সমাজসেবী নই, বড়জোর একজন কো অর্ডিনেটর মাত্র।
  • আগামী দিনে আপনার লক্ষ্য কি?

  কিছু মানুষ তৈরি করা আর মানুষ জোটানো। আমি সবসময় চেষ্টা করি আরও কিছু মানুষকে তৈরি করতে যাদের নিয়ে একসাথে লড়তে পারব। যে যেখানে লড়ে যাবে আমাদেরই লড়া। আমার কাছে সামাজিক কাজ বলতে শুধু পিছিয়ে পড়া মানুষদের নিয়ে কাজ নয়, রক্ত নিয়ে কাজ নয়, আরও অনেক মানুষ তৈরি করতে হবে যারা শক্ত হাতে কাজ করে যাবে। আমি নাম, ব্যানার এসবে বিশ্বাস করিনা, বিশ্বাস করি মানুষে। এও আমার শিক্ষা, বারবার করে সঞ্জীব বিশ্বাস মনে করিয়ে দেন। মানুষ যত বাড়বে নিজের সিগারেটের খরচও কমবে, সবাই কাউন্টারে সিগারেট খাওয়ায়।
  •  সাফল্য বলতে আপনি কি বোঝেন?

সাফল্য মানে কারোর থেকে কিছু পাওয়ার আশা না রেখেও যখন অনেক কিছু পাই। সাফল্য এটাই যখন রক্ত

বিরহড় বাচ্চার সাথে খুনসুটির মুহূর্তে

দিতে দিতে একসাথে সবাই গান গাই। সাফল্য এটাই যখন আমাদের রক্তদান শিবিরে ব্লাড ব্যাঙ্কের কর্মচারীও শুয়ে রক্ত দেন। সাফল্য এটাই যখন এক কাপড়ে বিরহড়দের গ্রামে যাই তখন কেউ জামা এগিয়ে দেন পরতে, কেউ সাবান তেল গামছা দেন স্নান করতে, কেউ মায়ের মত ভাত বেড়ে দেন। সাফল্য এটাই যখন একজন ভ্যান ওয়ালা নিজের বিড়িটা এগিয়ে দেন কাউন্টারে খেতে। সাফল্য একটা কোন নির্দিষ্ট বিষয় বস্তু নয়, সাফল্যর মানে আমার কাছে সময় বিশেষে জায়গা বিশেষে পাল্টায়।

  •  প্রেম করেন? কি মনে হয়, প্রেমিকা/স্ত্রী আপনার এই ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো মেনে নেবে?

রিস্ক নিয়ে লাভ কী! তবে প্রেমে আছি, সবসময় আছি। আমাদের দেশের রাষ্ট্রনেতারা যদি প্রেম না করে অন্ততপক্ষে প্রেমে থাকতেন দেশটা কী সুন্দর হত। কজন মন্ত্রী রাস্তার কুকুর ছানাকে তুলে আদর করে জানিনা, কজন কাউন্সিলর ছোট নদীতে পা ডুবিয়ে গাছের ছায়ায় বসেন জানিনা, প্রেমে নেই বলেই হয়ত অসহিষ্ণুতা বাড়ে।

  • আল্টিমেট গোল কী?

গোল তৈরি করতে থাকা, থেমে না থাকা। যখন যাই করব ফোকাসড হয়ে কনফিডেন্স ধরে রেখে করব, আর নয়ত করবনা। এই মুহুর্তে দাঁড়িয়ে আমার গোল বিরহড় দের জন্য সমান্তরাল জীবিকার সন্ধান করা, তাদের সাথে একসাথে পড়াশোনা শেখা, আর তাদের অর্জন করতে শেখানো। আর তার সাথে নিজেদের ধারণক্ষমতা বাড়ানো, নিজেদেরকেও তৈরি করা।

Goal বলতে Go with all. একা কিছু হয়না।
  •  কিভাবে চাষের আইডিয়া মাথায় এলো? 
  আমাদের বেঁচে থাকতে গেলে একটু জল, একটু মাটি দরকার। বাকি সবটুকু ওই থেকেই হবে। তাই একদম বেসিক জায়গা থেকে ভাবছিলাম। কোন যান্ত্রিক সেটআপ (কোন প্ল্যান্ট বা প্রোডাকশন) প্রথমেই করিনি কারন টাকা নেই। তাহলে উপায়!
চাষাবাদে সহায়তা করার মুহূর্তে
  সামনে পাট্টার জমির ওপর জঙ্গল হয়ে গেছে আগাছার। তখনই মাথায় এলো চাষের কথা। একটা সপ্তাহে গিয়ে গ্রামের সবাইকে মোটিভেট করে গোটা আগাছার জঙ্গলটা পরিষ্কার করি, মাটি বেরোয়। তারপর একসপ্তাহ ধরে বেশিরভাগ পাথর বাছাই করি, যেহেতু পাহাড়ের পাদদেশ তাই পাথর বেশি। তারপর জল দিয়ে মাটি ভিজিয়ে পাশের গ্রাম থেকে বলদ নিয়ে এসে হাল দিই। দুসপ্তাহের মধ্যে ৮ কাঠা মত জমি চাষের জন্য প্রস্তুত। এবার যারা চাষ বোঝে তাদের সাথে (অমলেশ কুমার, আদিত্য মাহাতো, বিধুভূষণ হাঁসদা) পরামর্শ করে বীজ নির্বাচন করা হয়, ১৩ রকমের বীজ লাগানো হয়। তারপর আড়াই মাসের মধ্যে সবাইকে চমকে দিয়ে বিরহড়দের সবুজ শস্য সন্তানরা জন্ম নেয়।
সবুজ ফসল

তাঁরাও বেশ আত্মবিশ্বাসী এখন অনেকটা। নিজেরাই কুঁদরি লতা, সাদা নোটে, টম্যাটো চাষ করেছেন, যে উপজাতি কখনও চাষই করেনি তারা ধীরে ধীরে চাষের দিকে ঘুরছে। এখন যদিও নিজের পেট চালাতে চাষ করছে, কিন্তু এই অভ্যেস গড়ে ওঠার পর বড় জমিতে চাষ করে নিজেদের পেট চালানোর মত শস্য রেখে বাকিটা সরাসরি বাজারজাত করা হবে।

  •  জল বাঁচানোর আইডিয়া কিভাবে এলো?

    মূল চ্যালেঞ্জ ছিল জল। মাটিতে বসে কয়েকজন মিলে কথা বলছিলাম গ্রামে। একজন এসে টিউবওয়েল থেকে জল নিচ্ছিলেন, বসেই দেখলাম ব্যবহৃত জল আউটলেট থেকে সরাসরি মাটিতে মিশছে। সেখানে যদি কোন রিজার্ভার রেখে ওই জলটা ধরতে পারি তাহলে সেটা চাষের কাজে লাগানো যাবে। যেমন ভাবা তেমন কাজ, সবাই মিলে মাটি খুঁড়ে ২০০ লিটারের একটা ড্রাম দিয়ে রিজার্ভার করা হল, আর তাতেই ব্যবহৃত জল ধরে রাখা গেল। জল অপচয়ও হলনা, কাজেও লাগল।
  •  পড়াশোনা বা স্কুলটা কি সরকারি অ্যাফিলিয়েশন করানো হবে?

    এখনও অবধি স্কুল গড়া হয়নি, গ্রামেই একটা ক্লাস চালানো হয়। বাকিটা ক্রমশ প্রকাশ্য।
  •    শিক্ষক কি লোকাল না বাইরের হবে ভবিষ্যতে?

  এখন যিনি পড়াতে আসেন তিনি একজন শিক্ষিত সাঁওতাল, যিনি বাংলা হিন্দী ইংরাজী অলচিকি চারটি ভাষাতেই দক্ষ, এমনকি চাষের কাজেও দক্ষ। একজন অবাক করা ব্যক্তিত্ব।

ভবিষ্যতের কথা ক্রমশ প্রকাশ্য, কিন্তু সব ক্ষেত্রেই একটা জিনিসে আমরা জোর দিই সেটা হল স্থানীয় বাজার বা দোকান থেকেই যাবতীয় জিনিস নিয়ে যাই, আমাদের শহর থেকে কিনলে হয়ত একটু কম পড়ত কিন্তু তবুও স্থানীয় জায়গা থেকেই কেনা হয়ভতার একমাত্র কারন স্থানীয় ক্ষুদ্র অর্থনীতি। যে মানসিকতার জায়গা থেকে অর্থ উপার্জন করতে শেখাচ্ছি সেখানে যদি কলকাতা থেকেই সব সরবরাহ করি তাহলে ঘুরে ফিরে নিজেরাই এক ভুল করব।

তাদের জন্য বানানো স্কুলঘর
  • যদি আপনাকে একদিনের জন্য প্রধানমন্ত্রী করা হয় আপনি কী করবেন?

ফাটাফাটি প্রশ্ন।
(যদিও সরকারি ভাবে কিছু নিয়ম পাল্টাতে গেলে বিল আনতে হয়, তারপর তা গ্রাহ্য হলে আইন হয়, তাই তা কখনই একদিনে সম্ভব না। তাই মজার ছলে হালকা করেই বলছি।)
 প্রথমেই কাস্ট রিজার্ভেশনে এসেসমেন্ট আনব, একমাত্র যারা সব থেকে সামাজিক ভাবে অবহেলিত অবস্থায় রয়েছে তারাই সুযোগ পাবে। যারা আগে সুযোগ পেয়ে গেছে এবং অর্থনৈতিক ভাবে প্রতিষ্ঠিত তাদের বংশধরদের একদম শেষে সুযোগ দেওয়া হবে, প্রথমে সুযোগ পাবে যে এস সি বা এস টি রা ফার্স্ট জেনারেশন লার্নার।
তারপর, সব চাষীর জন্য বীজ বিনামূল্যে পাওয়ার ব্যবস্থা করব এবং কৃষি ঋণ মকুব করব।
তারপর, আইটি সেল বন্ধ করে অনলাইন দাতব্য চিকিৎসালয় খুলব।
তারপর, মন্ত্রী হতে গেলে ন্যূনতম যোগ্যতার পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করব। চা বিস্কুট ওয়ালাকে আগে সরাবো। চা বিস্কুট বিক্রেতাকে সম্মান করি, কিন্তু বন্যেরা বনে সুন্দর। আমাকে যদি এখন হার্ট অপারেশন করতে বলা হয় আমি যেমন ছড়াবো, তেমনি অবস্থা এখন দেশের।
তারপর, সব ব্লাড ব্যাঙ্কের স্টক আপডেট এবং ব্লাড কালেকশন বা ইস্যু সেন্ট্রালাইজড করব এবং স্বচ্ছতা রাখতে সবটা অনলাইনে পাবলিক করা থাকবে। সবার জন্য ওপেন।
  তারপর, একজন নেতা মাসে যত মিনিট বক্তৃতা দেবেন, তাকে দশ দিয়ে গুন করলে যত হয় ততমিনিট যদি মানুষের মাঝে নেমে কাজ না করে তাকে আর সভা করতে দেওয়া হবেনা। এটা মনিটরিংয়ের জন্য পুলিশের জামায় যেমন ক্যামেরা লাগানো থাকে, এম এল এ- এম পি দেরও তাই থাকবে।
তারপর, আবগারি দপ্তরে বিপিএল কোঠা চালু করার কথা চিন্তা করতে বলব রাতে চেয়ার ছেড়ে ওঠার আগে।(সমাপ্ত)
হক কথার পক্ষ থেকে এক্সক্লুসিভ এই সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন অনুপম ভট্টাচার্য

8 COMMENTS

  1. সফলতার সংজ্ঞা:-

    আলি ‘ইমরান ৩:১৮৫

    … যে ব্যক্তিকে জাহান্নামের আগুন হতে রক্ষা করা হল এবং জান্নাতে দাখিল করা হল, অবশ্যই সে ব্যক্তি সফলকাম হল…

    কুরআন অ্যাপ পেতে :bit.ly/AlQuranApp

    #GreentechApps

  2. এই মানুষটির সাথে সামান্য দিনের পরিচয়। একসাথে কাজ করতে গিয়ে বুঝেছি অনেক কিছু শেখার আছে ওর থেকে। সপ্তর্ষি সত্যিই সপ্ত ঋষির প্রজ্ঞার সমাহার। ওর স্বপ্ন সফল হবেই।

  3. সন্তানসম সপ্তর্ষি তোমার এই সাক্ষাৎকার প্রৌড়ার চোখে জল আনছে তোমার গর্ভধারিনী কে শ্রদ্ধা জানাই। এমনই সন্তানের বাসনা লালন করুক আবিশ্ব মাতৃকুল।
    যদি পাশে দাঁড়ানো র কোন সুযোগ পাওয়া যায় ভালো লাগবে।
    কৃতজ্ঞতা যিনি সাক্ষাৎকারটি উদ্যোগী হয়ে নিয়েছেন ও প্রকাশ করেছেন।

  4. অসাধারণ মানুষ।
    অনুপ্রেরণাদায়ক কর্মপন্থা।
    ঈর্ষণীয় ভাবনা।

  5. Prajna Paramita Bhattacharjeeসন্তান সম সপ্তর্ষি,সিক্ষাৎকারটি এই প্রৌড়াকে আপ্লুত করলো।স।সম্মান জানাই তোমার গর্ভধারিণী কে।তোমার মননে যাঁদের অনির্বাণ ভূমিকা তাদের কাছে আমরা মায়েরা কৃতজ্ঞ রইলাম।সন্তান কামনায় তুমি দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠো এই শুভ কামনাটুকু রাখলাম।কোন কাজে লাগলে আহ্লাদ হবে বয়সের গোধূলিবেলায়।

    যিনি সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ও প্রকাশ করেছেন তাঁর প্রতিও অসীম কৃতজ্ঞতা।

  6. সপ্তর্ষি,

    এগিয়ে যাও।
    খুব ভালো লেগেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here