জীবনের পাঠশালায় নতুন অতিথি…

 

 জীবনের পাঠশালায় আমাদের আজকের অতিথি অর্কেন্দু ভট্টাচার্য। মা-বাবার একমাত্র সন্তান অর্কেন্দু পেশায় ছাত্র, নেশা সমাজের জন্য সদর্থক কিছু করে যাওয়া। আসুন আজ আপনাদের অর্কেন্দুর গল্প শোনাই।

১) আপনার ছোট বেলার দিনগুলো সম্পর্কে কিছু বলুন। পরিবারের কথা, বন্ধুদের কথা।

উঃ অধমের জন্ম রাণাঘাটে। দুই মামা, আর দুই মাসি, দাদু আর দিদা, এই নিয়ে জমজমাট পরিবার। মা-মামা-মাসি মিলে পুরো পঞ্চপাণ্ডব টিম। ছোটবেলায় আমার কান্নার চোটে আসে পাশে সবার ঘুম উড়িয়েছি, এখনও মামাবাড়ি গেলে সেই নালিশ শুনতে পাই। কি আর করি? লাউড স্পিকার ইনবিল্ট।

তারপর আসি নিজের বাড়ির কথায়। আমার বাড়ি বেলুড়ে। পরিবারে আমি মা আর বাবা। মধ্যবিত্ত সুখী পরিবার। দাদু, আর ছোট পিসিকে দেখিনি। ঠাম্মার কোলে শুয়ে নানান গল্পে দিন কেটেছে। মা খুব একটা বাইরে বেরোতে দিত না, তাই বন্ধু পাতানো শুরু হয় দেরিতে। তবে মা একটু বড় হতে আমায় ক্রিকেট কোচিং এ ভর্তি করে, নানান মানুষের সাথে মিশতে শুরু করি। আর বুঝতে শুরু করি, একসাথে বেঁধে বেঁধে থাকার মজা।

২) স্কুল, কলেজ কোথায়? সেই সব বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ আছে?

পড়াশোনা শুরু হয় সাড়ে তিন বছর বয়সে। উত্তরপাড়া মডেল স্কুলে। সেই স্কুলের লাস্ট বেঞ্চে বসে গল্প করতে করতে জনা পাঁচেক সঙ্গী জুটিয়ে ছিলাম বটে। আস্তে আস্তে সবার সাথে মেলামেশায় সাবলীল হই। অন্যের সাথে মেশার ভয়টা কাটে। তারপর পাড়ার সমবয়স্ক, ছোট বড় সবার সাথে ভালোই ভাব জমে। খুব স্পীডে কথা বলতাম তাই বেশিরভাগ কেউ বুঝতো না, এখনও সবাই প্রথমবারে বোঝে না।

প্রাইমারি স্কুল পেরিয়ে হাইস্কুলে উঠতে অনেক বন্ধু জুটিয়ে নিই,বকবক করাটা এইখানে কাজে আসে। তারপর লালবাবা কলেজে ইংলিশে অনার্স। স্কুল কলেজের বন্ধুদের এখনও অনেকের সাথে ঘনিষ্ঠ মেলামেশা আছে। সপ্তর্ষি, কৌস্তভ, অনিকেত, সৌরভ সাগরিকা। পড়াশোনা থেকে খেলাধুলা, আড্ডা থেকে আলোচনা,তর্ক বিতর্ক। একসাথে খুনসুটি, কেস খাওয়া। দারুণ ভাবে দিন গুলো তখনও কাটত। কর্মসূত্রে কেউ দূরে আছে আর কেউ কাছে, তবে সব মাথাগুলো এক হলে হইহই রবে আসর বসে বটে।

৩) সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে মানুষের জন্য কাজ করার এই ধরনের আইডিয়া মাথায় এলো কিভাবে?

বিরহড় শিশুদের সাথে

ফেসবুকে হাতেখড়ি ক্লাস ১২ পেরিয়ে। তখন সব পরিচিত বন্ধুবান্ধবদের সাথে এমনিই দেখা হত। তাই সোশ্যাল মিডিয়ার উপর নির্ভরশীলতা ছিল কম। কিন্তু উঁচু ক্লাসে উঠতে উঠতে সবার সাথে যত দূরত্ব বাড়ল, ততই সোশ্যাল মিডিয়ার সাথে জুড়তে থাকলাম। আমি আর আমার বন্ধুরা মিলে আসর বসাতাম কারোর না কারোর বাড়িতে। যতদূর মনে পড়ে ডিসেম্বর মাস। ঠান্ডায় অবস্থা খারাপ। আমি আর সপ্তর্ষি এক বন্ধুর বাড়ি থেকে আড্ডা মেরে ফিরছি। পথের ধারে ঠান্ডায় কাঁপতে থাকা কিছু মানুষকে দেখলাম। মনটা কেমন যেন ভারী হয়ে গেল। যদি এনাদের জন্য কিছু করতে পারতাম! চার বন্ধু মিলে ঠিক করলাম যদি ওনাদের জন্য কিছু করা যায়,যদি একটু উষ্ণতা পৌঁছে দেওয়া যায়! ভেবেই বেশ তৃপ্তি লাগল। লেগে পড়লাম কাজে। উদ্দ্যম বিশাল কিন্তু আইডিয়া স্বল্প, স্বল্প যোগাযোগ পরিচয়ও। ঠিক করলাম ফেসবুকে এত বন্ধু আছে, ডাক দিয়ে দেখি। কিছু মানুষকে তো পাবো। আমাদের ডাকে বেশ ভালোই সাড়া আসে। হাতে হাত রেখে নেমে পড়লাম কাজে, আর আমাদের এলাকার দুঃস্থ মানুষগুলোকে সেই ঠান্ডায় একটু হলে আশ্র‍য় দিতে পেরেছিলাম নিশ্চয়ই। পরের বারে দেখাতে তারাও যখন আমায় দেখে এক গাল ভরে হাসতো, খুব ভালো লাগত। বুঝতাম একটা মানুষের মুখে তো হাসি ফোটাতে পেরেছি৷ তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় যাওয়ার আগেও আমি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা পেয়েছিলাম মায়ের থেকে৷ দেখেছিলাম মা কি সুন্দর অপরিচিতের সাথে বন্ধুত্ব করে নিতে পারে, তাদের প্রয়োজনে কিরকম সুন্দর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। মানুষ হয়ে আর একজন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বিষয়টা মনে হয় একটু হলে জিনগত। 😁😁

৪) জীবনে সাফল্য বলতে আপনি কি বোঝেন? সফলতা মানে কি ভালো চাকরি, বাড়ি, গাড়ি?

সফলতার সংজ্ঞা কি হয়? এখনও বুঝতে পারিনা। তবে আর যাই হোক না কেন, নামী জায়গায় চাকরি, গাড়ি, বাড়ি, ব্যাঙ্কব্যালেন্স নয় এটুকু খুব ভালো ভাবে জানি এবং মানি। কারণ আমি এখনও একজন ছাত্র। চাকরির প্রিপারেশন নিচ্ছি। যখন রাতবিরেতে ফোন আসে রক্ত, ওষুধ কিংবা অন্য দরকারে তখন নিজের সাধ্যমত চেষ্টায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পর তাদের হাসিভরা গলা, আর আশীষ পাই,তখন বুঝি সফলতা কোথায়! বিশাল অঙ্কের টাকা, গাড়ি, দামী জিনিস না থেকেও রাত্রিতে বেশ শান্তির ঘুম আসে। আমি তো একটু হলেও সফল, সফল মানুষের পাশে দাঁড়াতে। আর চাই যেন কোনোদিন সম্পূর্ণ সফল না হই, তাহলে যে আর নতুন কিছু জানার বা করার ইচ্ছাটা পাবো না। একটু ব্যর্থ থাকি, ব্যর্থতা থেকে শিখি,আবার একটু সফল হই।

৫) রাজনীতি করার ইচ্ছে আছে?

এই বিষয়টা এখনও বুঝে উঠতে পারলাম না। আর সত্যি কথা বলতে বুঝতেও চাই না। তাই যোগদানের ইচ্ছাও নেই। রাজার নীতি- রাজনীতি না হয়ে মানুষনীতি হলে আমি সবার আগে যুক্ত হব। কথা দিলুম।

৬) করোনা সংক্রমণের ভয়ে যেখানে মানুষ অন্যের ছোঁয়াও এড়াতে চাইছে, সেখানে আপনারা স্বেচ্ছায় মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছেন। মরার ভয় পাচ্ছেন না?

শুনতে সিনেমার ডায়লগ মনে হলেও এটা বলব। সমাজের জন্য মরতে চাই না, বরং আরও বেশী করে বাঁচতে চাই, যাতে আরও কিছু মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে পারি, তাদের হাসি শুনতে পারি, আর তাদের আশীর্বাদের ছোঁয়া পাই। করোনা মানুষকে ঘরবন্দী করলে মানুষের যেন মনবন্দী না হয়, সেটাই সবসময় চাই। কথাটা সোশ্যাল ডিস্টেন্স হওয়া উচিৎ নয়। ফিজিক্যাল ডিস্টেন্সটাই যথেষ্ট। সমাজের থেকে দূরে চলে গেলে একজনের দরকারে আর একজন ঝাঁপাবে কিভাবে। প্রতিদিন নানান মানুষের নানান দরকারে ফোন আসে, তাদের সমস্যার কথা শুনি,আর আমার স্বল্প পরিচয়ে, স্বল্প ক্ষমতায় আর আশে পাশে থাকা অগুনতি প্রিয় মানুষের সহায়তায় সব সমস্যাই ঠিক উতরে যাই। আমি একা কেউ নই, অর্কেন্দু ভট্টাচার্য্য একটা কেবল নাম, তাকে পূর্ণ করে অসংখ্য মানুষ। আমি অর্কেন্দু একা কিচ্ছু না কিন্তু সবাই মিলে আমি, এই আমি হয়ে উঠি। তাই করোনা থাকুক না আর নাই থাকুক, মানুষের প্রয়োজনে একসাথে মিলেমিশে লড়ে যাব। আমাদের অনেক বড় ব্যাটেলিয়ন, আর আমি তার এক সৈনিক।

৭) প্রেম করেন? প্রেমিকা / স্ত্রী আপনার এই ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর অভ্যাস মেনে না নিলে কি করবেন?

হ্যাঁ। প্রেম করি। বেশ অনেকদিনই হল। প্রেমিকা আমার এই ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো সম্পর্কে খুব ভালো ভাবেই জানে। সময় দিতে না পারলে খচে যায়,তবে নিজেই আবার মানুষগুলোর খবর নেয়। কথাও দিয়েছে পরবর্তীতে একসাথে মানুষের জন্য কাজ করবে। দেখা যাক কি হয়। পিকচার আভি বহুত বাকি হ্যায়!

৮) আগামী দিনে কাজের কি পরিকল্পনা?

আমি এবং আমার বন্ধু পরিবার এখন একসাথে পুরুলিয়ার এক আদিম জনজাতি বিরহড়দের জন্য একজোট হয়ে কাজ করছি। বিরহড়দের বিষয়ে ছোট করে বলি৷ ভারতের অন্যতম আদিম জনজাতির মানুষ এই বিরহড়রা মূলত জঙ্গলের উপর নির্ভরশীল। পাহাড়ে গিয়ে কাঠ কুড়িয়ে এনে, সেই কাঠ বেঁচে কোনোরকমে সংসার চালান। শিক্ষা, স্বাস্থ্যের অভাব স্পষ্ট লক্ষ্যণীয়। সমাজের মূলস্রোত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। আমাদের লক্ষ্য তাদেরকে চাষবাস শিখিয়ে স্বাবলম্বী করে তোলা, নিজেদের অধিকার বোঝানো, প্রকৃত শিক্ষার আলোয় আলোকিত করা, একসাথে মিলেমিশে থাকার গুরুত্ব বোঝানো, তাদের হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসকে সংরক্ষণ করা আর ধীরে ধীরে তাদের আবার সমাজের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনা। হতে পারে তাদের ভাষা, চেহারার ধরণ, খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাত্রা আলাদা, তবে তারাও আমাদের মতই রক্ত মাংসের মানুষ, আমাদের পরম আত্মীয়। আমাদের সাথে তাদেরকেও আগলে রাখব আমরা। স্বপ্ন দেখি তাদের মধ্যে থেকেই উঠে আসবে আর এক আম্বেদকর, তৈরী হবে প্রথম বিরহড় ডাক্তার, শিক্ষক, খেলোয়াড় আরও কত কি! আর সবার আগে হয়ে উঠবে একজন প্রকৃত মানুষ।

৯) একদিনের জন্য দেশের প্রধানমন্ত্রী করা হলে কি কি করতে চাইবেন?

রক্তদানের সময়

একদিনের জন্য প্রধানমন্ত্রী হয়ে হঠাৎ তো কিছুই পরিবর্তন করতে পারব না। তবে একটা চেইন শুরু করতে চাই। যেটা নিয়ে ব্যক্তিগত স্তরে কাজও শুরু করেছি। নিজের ভাইয়ের মতো বন্ধুকে রক্তের অভাবে মারা যেতে দেখেছিলাম একদিন। আমার কাছে রক্তের ভূমিকা সেদিন আরও অনেকটা স্পষ্ট হয়। মনে মনে স্থির করি আর কোনো ভাই যেন রক্তের অভাবে আমাদের ছেড়ে না যায়। তাই একদিনের জন্য প্রধানমন্ত্রী হলে একটা উৎসব আয়োজন করব। নাম, পদবী, ধর্ম,বর্ণ,জাতি, ভাষার উর্দ্ধে উঠে সবাই এই উৎসবে যোগ দেবে। *রক্তদান উৎসব*। অন্য উৎসবের মত বছরের বিশেষ সময়ে নয় বরং সারাবছর পালন হবে এই উৎসব। বারো মাসে নির্দিষ্ট এই এক পার্বণ। সেই উৎসবে আঠারো বছরের অধিক সকল সুস্থ নাগরিক বাধ্যতামূলকভাবে রক্তদান করবে। কোনোরকম অযুহাত যেন একটা মানুষকে পিছিয়ে যেতে না দেয় সেটার চেষ্টা করব। লাইন দিয়ে মানুষজন ব্লাডব্যাঙ্কে ভীড় করবে,নিজেরাই আয়োজন করবে রক্তদান শিবিরের। তিনমাস হলেই দৌড় লাগাবে উৎসবে যোগদান করতে- প্রধানমন্ত্রী হলে এই স্বপ্ন সত্যি করবই!

 

হককথার পক্ষ থেকে এক্সক্লুসিভ ইন্টারভিউটি নিয়েছেন অনুপম ভট্টাচার্য।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here