১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহের পর মুঘলবংশীয়দের অবস্থা

  ১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহ উক্ত বছরের প্রথম দিকে শুরু হলেও ব্রিটিশ বিদ্রোহের প্রাণকেন্দ্র দিল্লির শেষ মুঘল বাদশাহ যেখানে অধিষ্ঠিত সেই লাল কেল্লা অভিমুখে আক্রমণ শুরু করে ১৪-ই সেপ্টেম্বর এবং ১৯-শে সেপ্টেম্বরের্ই বুঝতে পারা যাচ্ছিল লালকেল্লার পতন অনিবার্য।

সেদিন রাতেই বাহাদুর শাহ জাফর তাঁরই পূর্বপুরুষ দ্বিতীয় মুঘল হুমায়ুনের মাজার বিশাল হুমায়ুন মকবরায় আশ্রয় নেন। কেল্লার অন্যান্য ব্যক্তিবর্গ বুঝতে পেরেছিল শিঘ্রই ফিরিঙ্গিরা কেল্লা দখল করে নেবে, তাই একে একে প্রায় সকলেই কেল্লা ছাড়ছিলেন। ২০-শে সেপ্টেম্বর ৫০ জন পাঞ্জাবি সেনা নিয়ে ক্যাপ্টেন হাডসন হুমায়ুন মকবরায় গিয়ে সম্রাট, জিন্নত মহল ও পুত্র জওয়ান বখতকে নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে লালকেল্লায় ফিরিয়ে আনে। পরদিন বাদশাহ পুত্র মির্জা মোগল, খিজির সুলতান ও আবুবকরকে মকবরা থেকে ধরে লালকেল্লা আনার পথে হাডসন গুলি করে মারে। দিল্লির রাস্তাঘাটে অরাজকতা শুরু হয়। ব্রিটিশ যার সঙ্গে সামান্যতম বিদ্রোহ সংযোগের গন্ধ পায় তাকেই নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। যারা মারা গিয়েছিল তারা একপ্রকার বেঁচে গিয়েছিল। কিন্তু যারা বেঁচেছিল তাদের চরম দূর্ভোগ পোয়াতে হয়। অসংখ্য মুঘল শাহজাদা-শাহজাদির মধ্যে কয়েকজনের ভাগ্য বিড়ম্বনার বর্ণনা দেওয়া হল।

বাদশাহ কন্যা কুলসুম জামানি বেগম তাঁর দেড়বছরের শিশুকন্যাকে নিয়ে চরম বিপদে পড়ে যান। সম্রাট হুমায়ুন মকবরায় যাওয়ার আগে কুলসুমকে ডাকলেন। সম্রাট জায়নামাজে বসে, কুলসুম তাঁর স্বামী মির্জা জিয়াউদ্দিন, সম্রাটের অপর স্ত্রী নূর মহল, ভগ্নিপতি মির্জা ওমর সুলতান ও বেয়ান হাফিজা সুলতানকে বিদায় জানাবার আগে আল্লাহর কাছে তাঁদের ও হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সমস্ত প্রজার সুরক্ষার দোয়া চেয়ে নিলেন। তাঁদের কিছু অলংকার দিয়ে বললেন লাল কেল্লাতে সম্রাটের সঙ্গে থাকা নিরাপদ হবে না। বরং তারা নিরাপত্তার জন্যে অজানার উদ্দেশ্যে বার হয়ে যাক।

রাতের শেষ প্রহরে আকাশে শুধু শুকতারা দেখা যায় এইরকম সময়ে গরুর গাড়ি চড়ে দুই পুরুষ ও তিন নারী বার হলেন। প্রথম গন্তব্য কোরালি গ্রামে পৌঁছে চালকের বাড়িতে মোটা বজরার রুটি দই দিয়ে খাওযার পর হঠাৎই জাঠ ও গুজ্জরদের লুঠতরাজের সামনে পড়ে সর্বস্ব খোযালেন। তবে ওই গ্রামেরই বাস্তি নামক সম্পন্ন চাষি তাঁদের গাড়িতে করে মিরাট পৌঁছে দিলেন। মিরাটে শাহি হাকিম মীর ফয়েজ আলি ব্রিটিশের ভয়ে তাঁদের আশ্রয় দিলেন না। তৃতীয় দিনে কোয়ালের নবাব তাঁদার হাতির পিঠে চড়িযে নদী পার করে দিলেও ব্রিটিশ বাহিনির সঙ্গে নবাবের যুদ্ধে তাঁরা আবার বিপদে পড়ে গেলেন। বাস্তি এরপর তাঁদের এক মুসলিম গ্রামে নিয়ে আসে। রাতে সম্রাট পরিবারের স্থান হল খড়ের বিছানায়, উপরি রাতভর শিয়ালের ডাক আর মশার কামড়। জব্বলপুর হয়ে শাহি কাফেলা হায়দরাবাদ পৌঁছলে সিতারামপেটে বাড়ি ভাড়া নিলেন। জিয়াউদ্দিন ছিলেন লিপিকার। তিনি স্বহস্তে দরুদ শরিফ লিখে ভালোই রোজগার করতেন। কিন্তু এখানেও মুঘল বংশীয়দের উপর ব্রিটিশ রোষ ঝরে পড়লে পুরো পরিবারটিই আত্মগোপণ করে। তবুও পেটের টানে নবাবের পুত্রকে কোরআন শেখানোর কাজ নিলেন। অবশেষে নিজাম ও সম্রাটের পির হযরত কালে মিয়া চিশতি নিজামী ফখরির পুত্র মিয়া নাজিমুদ্দিন তাঁদের পরিচয় জানতে পারলেন। তিনি সম্রাটের পরিবারের দুঃখ-কষ্টের কথা শুনে তাঁদের হজে যাওযার ব্যবস্থা করলেন।

বাদশাহ শাহ আলমের অপর এক পুত্র যাঁর সঙ্গে বাহাদুর শাহ জাফরের সম্পর্ক ভালো ছিল না। তবে তিনি লালকেল্লার এক প্রান্তে স্ত্রী, ষোল বছরের এক পুত্র ও এগারো বছরের কন্যা নিয়ে বাস করতেন এবং বাদশাহর কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা পেতেন। বাদশাহ কেল্লা ছেড়া যাওযার তিন দিন পর ১২ জন ফিরিঙ্গি ও সমসংখ্যক শিখ সেনা তাঁদের মজবুত বাড়ির দরজা ভেঙে ধরে নিযে যায়। এই পরিবারের এক প্রাক্তন পরিচারক চুরির দাযে বিতাড়িত হয়। সে ব্রিটিশদের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি নিয়েছিল। প্রতিশোধস্পৃহ ওই পরিচারক মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় যে দিল্লির ব্রিটিশদের হত্যার জন্যে ওই পরিবারের পুরুষরা দাযী। এই সাক্ষ্যর উপর ভিত্তি করে পুরুষদের হত্যা করা হয়। স্বামী ও পুত্রশোকে মুহ্যমান বাদশাহর বধূ ও শাহজাদিকে টানতে টানতে রাস্তায় নামিয়ে ছেড়ে দেওযা হয়। এরপর জ্বরে বধূটি মারা গেলে কয়েকজন মিলে তাঁকে দাফন করে সমস্ত টাকা-পয়সা লুঠ করে একাদশ বর্ষীযা বালিকাকে আজমিরি গেটে বসিয়ে দিয়ে চলে গেল। এক সহৃদয় স্যাকরা আরও কয়েকটি মেয়েকে নিযে দিল্লির বাইরে পালাচ্ছিলেন। তিনি শাহজাদিকেও সেই দলে আশ্রয় দিলেন। পরে দিল্লি শান্ত হলে বেঁচে থাকা মুঘল বংশীয়দের হাতে শাহজাদিকে তুলে দেন।

বাহাদুর শাহ জাফর তাঁর বয়সজনিত কারণে প্রথমদিকে বিদ্রোহে সামিল হতে নিমরাজি ছিলেন পরে সিপাহি, শাহজাদা ও সাধারণ মানুষের অনুরোধে বিদ্রোহে যোগ দেন। হাডসনকতৃক নিহত তিন শাহজাদার বাইরেও সম্রাটের পুত্র-পৌত্র মিলিয়ে প্রচুর শাহজাদা বিদ্রোহে শামিল হয়েছিলেন। এইরকমই এক শাহজাদা ছিলেন মির্জা শাহরুখ। তিনি তাঁর সপ্তদশ বর্ষীয়া বিদুষি কন্যা নার্গিস নজরের পরা্মর্শে হুমায়ুন মকবরায় যাননি ফলে প্রাণে বেঁচে যান। তবে তাঁর কোন খোঁজ পাওযা যায়নি। তাঁর একমাত্র কণ্যা নার্গিস ছিলেন মহলের সব থেকে সৌখিন শাহজাদি। গ্রীষ্মে থাকতেন লালকেল্লার পানির নহরের মহলে। দাস-দাসী পরিবৃতা সোনার পালঙ্কে মাথার বালিশ, পাশ বালিশ ছাড়াও ছিল গাল বালিশ। সম্রাট চলে যাওয়ার পর লালকেল্লা খালি হতে থাকলে তিনিও তাঁর ধাইমার বাড়ি গাজিনগর বা বর্তমান গাজিয়াবাদ অভিমুখে যাত্রা করেন। পিতাকেও সেই পরামর্শ দেন। সঙ্গের সোনা-রূপা, মণি-রত্নের বাক্সটিকে দাইমার পরামর্শে মাটিতে পুঁতে দিলেন। ইতিমধ্যে দুইজন শিখ সহ ইংরেজবাহিনি গাজিয়াবাদে পৌঁছে নার্গিসকে দিল্লিতে ধরে নিযে যায়। পথে জাঠ ও গুজ্জররা ইংরেজবাহিনিকে হত্যা করে তাঁর পরণের কাপড় কেড়ে নিয়ে ছেঁড়া কাপড় পরিয়ে দেয়। এই অবস্থায় নার্গিসকে এক মুসলিম শ্রমজীবি ঘরে নিয়ে গিয়ে প্রধানের পুত্রের সঙ্গে বিবাহ দেন। গুপ্তচর মারফৎ নার্গিসের পরিচয় পেয়ে ইংরেজ তাঁর শ্বসুর ও স্বামীকে দায়ি করে ১০ বছর কারাদন্ড দেন। নজরকে দিল্লির এক মুসলিম সিপাহীকে দিয়ে দেওযা হল। সেখান থেকে এক বৃদ্ধের বাড়িতে। সেখান থেকেও অপহৃত হয়ে অপর এক গ্রাম প্রধানের বাড়িতে আশ্রয় পান। অবশেষে চার বছর পর তাঁর স্বামী ছাড়া পেলে স্বামীর ঘরে ফিরে যান। সেখান থেকে দাইমার বাড়িতে সেই স্বর্ণালঙ্কারের বাক্স খুঁজতে গিয়ে দেখেন কে আগেই নিয়ে চলে গেছে।

বাহাদুর শাহ জাফর লালকেল্লা থেকে বার হয়ে হুমায়ুন মকবরাতে পৌঁছনোর আগে প্রথমে নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মাজারে প্রবেশ করেন। সঙ্গে ছিল কয়েকজন খোজা ও পালকির বেহারা। সেখানকার বর্ণনা দিচ্ছেন নিজামউদ্দিন আউলিয়ার বংশধর শাহ গোলাম হাসান। তিনি দেখলেন, বাদশাহ আউলিয়ার সমাধিতে হেলান দিয়ে বসে আছেন। হতাশ, সন্ত্রস্ত, ম্লান মুখশ্রী, শ্বেতশুভ্র দাড়ি ধূলিধূসরিত। সম্রাট, সিপাহিদের দোষারোপ করে বললেন, ওরা মুখে বড় বড় কথা বলেছিল, আগেই বলেছিলাম নিজেরাই ডুববে আমাকেও ডোবাবে। সব কিছু ছেড়ে ভিক্ষুকের মত পালিয়ে এসেছি। হিন্দুস্থানে তৈমুরের আমিই শেষ বংশধর তবে তৈমুর বংশীয়রা এর থেকেও খারাপ পরিস্থিতির মোকাবিলা করেছে। যে বংশের বাতি নিবছে তার জন্যে লড়াই, রক্তপাতের কি প্রয়োজন? আমরা কয়েকশো বছর দাপটে রাজত্ব করেছি এখন আমরা পরাজিত এখন নতুন বাদশাহ আসবে। এরকম তো আমরাও করেছি, অন্যের ঘর ভেঙেছি।

এরপর বাদশাহ গোলাম হাসানের হাতে একটি ছোট বাক্স তুলে দিয়ে বললেন, “আমীর তৈমুর ইস্তাম্বুল দখলের সময় (১৪০২) ওসমানিয়া সুলতান বায়েজিদ ইলদিরিমের কোষাগার থেকে এটি পেয়েছিলেন। এর মধ্যে হযরত মহম্মদ (সঃ)-এর পাঁচটি দাড়ি মুবারক আছে। আমাদের খান্দান এটা পবিত্র মনে করে সংরক্ষণ করে এসেছিল। এখন কোথায় রাখব? পৃথিবী বা পাতালে কোথাও আশ্রয় নেই। নাও এটা রেখে দাও।” এখনও বাক্সটি নিজামুদ্দিনের তোষাখানায় সংরক্ষিত আছে।

সম্রাট আরও বলেন, তিন বেলা তিনি খাননি, কিছু খাবার খেয়ে হুমায়ুন মকবরায় চলে যাবেন। ডামাডোলের বাজারে আউলিযা পরিবারেও রান্না হয়নি। অবশেষে রুটি ও চাটনির ব্যবস্থা হল। আউলিয়ার বংশধর বললেন, সম্রাট তাঁদের সঙ্গেই অবস্থান করুন। তিনি ও তাঁর সন্তানেরা তাঁকে প্রাণ দিযে রক্ষা করবেন। সম্রাট বললেন, এই বুড়োর জন্যে আউলিয়া পরিবারকে বিপদে ফেলতে চান না। রুটি-চাটনি খেয়ে সম্রাট নিকটেই হুমায়ুন মকবরায় আশ্রয় নিলেন। রেঙ্গুনে নির্বাসিত হয়েও সম্রাট দরবেশের জীবনযাপন করতেন, দিল্লিতে যেমন করতেন।

  খাজা হাসান নিজামি লিখিত ‘বেগমত কি আঁশু’ বইটি মহাবিদ্রোহের কয়েকবছর পর লেখা হয়। সেই অর্থে বইটি নিজেই ইতিহাসের অংশ। বইটির নামকরণে সার্থকতা আছে বাদশাহ, শাহজাদি, শাহজাদাদের অন্তিম পরিণতি পড়ে আঁশু বা কান্না সামলানো কঠিন।

লেখকঃ আতিকুর রহমান চৌধুরী (বিশিষ্ট শিক্ষক কলামিস্ট) 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here