গুপির গান ও আধুনিক যুগ – সৌমিক কান্তি ঘোষ

  আমরা জানি চলচ্চিত্র হল প্রথাগত শিল্পগুলির মধ্যে কনিষ্ঠতম এবং মিশ্রণ শিল্প। শ্রী রায়ের চলচ্চিত্র শিল্পে সংগীতের ব্যবহার প্রাচ্য -পাশ্চাত্যের মিশ্রনে সংযত অথচ চাতুর্যপূর্ণ। সামান্য কোনও এক শব্দকে সিনেমাটিক রিয়ালিটি তৈরির প্রেক্ষিত প্রাসঙ্গিকতায় উর্ত্তীর্ণ করতে তিনি সিদ্ধহস্ত, মনে করুন বাঘার ঢাকের ওপর টপ টপ করে পড়তে থাকা জলের শব্দ। চলচ্চিত্রে সংগীতের প্রয়োগ ধর্মিতা এবং বাস্তবসম্মত ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক থাকলেও একটি ব্যাপারে সমালোচকরা একমত যে সত্যজিৎ রায় তার ছবিতে সঙ্গীত চেতনাকে সামগ্রিক পরিপ্রেক্ষিতে অর্থবহ ও শিল্পময় করে তোলেন। আমরা অবশ্য এখানে শুধুমাত্র গুপির গানের পরিসরটি নিয়ে আলোচনা করবো।

তিন নম্বর বরে গুপী চেয়েছিলো,’সানি ধাপা মা গা রে সা ‘ গাইতে পারি। উত্তরে ভুতের রাজা বলেছিল-হবে হবে হবে হবে, তাল হবে, লয় হবে /লোকে শুনে ভ্যাবাচাকা/স্থির হয়ে থেমে যাবে। অর্থাৎ মুগ্ধতা ও বাধ্যতার সংমিশ্রনে একধরণের ম্যাজিক রিয়ালিটির প্রতিস্থাপন। যে গুপীর সুর, তাল, লয় কিছুরই বোধ নেই আছে শুধু একটা তানপুরা আর গানের প্রতি তীব্র প্যাশন, তার গলায় যদি গান দিতে হয় তাহলে এমন একটি কণ্ঠ হাজির করতে হবে যার গলায় সুর ‘সব দিকে খেলবে ‘..হাতের কাছে কিশোর কুমার থাকলেও তিনি বেছে নেন অনুপ ঘোষালকে। একটি ফ্যান্টাসির পরিসরে গিয়ে কখনও লোকগান, রাগদারী গান,কর্ণাটকি কারণ ভূতের রাজার বরে গুপির সুরদক্ষতায় প্রকাশিত গানের ভিন্নধর্মিতা মূলত সুর ও কণ্ঠের সাবলীলতার মাধ্যমেই প্রতিভাত হবে। এক্ষেত্রে অনুপবাবুর সুরেলা, গতিময় এবং প্রথাগত ঝাঁকিহীন কণ্ঠ পরিচালককে আকৃষ্ট করে যেখানে তিনি ‘অমল’ বা ‘সন্দীপ ‘এর গলায় কিশোর কুমারকে হাজির করেন ,কারণ অমল চরিত্রের অপেরাটিক ঢং ও সন্দীপের’ গাম্ভীর্যের রেস্ট্রেইন্ট তা দাবি করে।

সেই গ্রাম বাংলা ,নিম্নবিত্ত পরিবারের দারিদ্রতা, অবুঝ-অপদার্থ-বেকার , সুর-তাল-লয়হীন অথচ সংগীত চর্চায় আগ্রাসী এক যুবা যখন গাধার পিঠে চড়ে গ্রাম ছাড়ে, আর পাঁচজন গ্রাম্য মানুষের ব্যাঙ্গ-বিদ্রুপে জর্জরিত, কলঙ্কিত গুপীর মুখে তখন শোনা যায়,’গুপী চললো বহুদূর ‘.. এই শুরু গুপির গলায় ছন্দের আভাস। বৃদ্ধ পিতা দূর থেকে হয়তো দু ফোঁটা চোখের জলের সঙ্গে এই আশীর্বাদই করেছিল,’ যা এই কুপমুণ্ডুকতার সংকীর্ণতায় আটকে না থেকে বৃহত্তর জগতে প্রবেশ করে। সংগীত, তাও আবার ধ্রুপদী, চর্চার অধিকার তো শুধু সমাজের এক বিশেষ অংশের জন্য, সবার জন্য নয়। নিম্নবর্গীয়, খেটে খাওয়া, দেহাতি মানুষগুলোর স্পর্ধা কী করে হয়, সা রে গা মা পা সাধবে, স্বাভাবিকভাবেই তাতে রাজার ঘুম ভাঙবে এবং তৃতীয় সুর ও ষষ্ঠ সুর মিলে আপদকে গ্রাম ছাড়া করা হবে। কিন্তু রাজা মশায় আপনি নিজের অজান্তেই সুর-তাল-লয়হীন নিম্নবর্গীয় গ্রাম্য যুবককে দিয়ে ফেললেন রাগ সংগীতের অন্যতম দুটি সুর-গা, ধা তারই আভাস গুপীর সুরে ফেরা ‘গুপী চললো বহুদূর’।
ছবিতে গুপির গলায় সুর আসার আগেই ভূতের রাজা সুর-ছন্দ-তাল নিয়ে হাজির হয়। পাঠক আপনি বোঝার চেষ্টা করুন, সম্পূর্ণ রাগধর্মী, উচাঙ্গ সংগীতের দাপটের (রূপকার্থে যা শ্রেণীসংগ্রামেরও) বিপরীতে যে লড়াই তার শুরু কিন্তু সমাজ বহির্ভুত, অবাস্তব, অনাকাঙ্খিত ভূতেদের গলার গান দিয়ে, যা একেবারেই গ্রাম-বাংলার ঝাড়-ফুঁক করা ওঝা বা দরবেশদের ছন্দ উচ্চারণে বিশ্লিষ্ট, হবে হবে হবে হবে /গান হবে ঢোল হবে ইত্যাদি, এভাবেই আসে দোতারার সাথে বেহালা ও চেলো, ঢোলের সঙ্গে ঘট্টম ও কঞ্জিরা। চিত্রনাট্যের পরম্পরায় বার বার তারা প্রাসঙ্গিক হয় পরিচালকের অঙ্গুলি হেলনে, সৃষ্টি হয় এক অনবদ্য ইন্সট্রুমেন্টাল কম্পোজিশনের।

গুপির গানের লিরিকের যে ভাষা বা শব্দ প্রয়োগ শ্রী রায় করেছেন তার অনেকটাই উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত। সুকুমার রায়ের কবিতা বা ছড়ায় ব্যবহৃত শব্দগুলি যেমন, ‘লক্ষণের শক্তিশেল ‘নাটিকায়, ‘লাখো লাখো সৈন্য চলে সাথে সাথে ‘; এবার গানটা দেখুন-‘কত সেনা চলেছে সমরে–হাজারে হাজারে ‘কিংবা সুকুমার রায়ের লেখায় -‘ওরে পালিয়ে যা, তা না হলে মরে যাবি, সাধ করে কে বল প্রাণটা হারাবে’; গুপী গাইলো, ‘কেটে পড়ি, ভেগে পড়ি মুন্ডু গেলে খাবটা কী’ এরকম উদাহরণ আরও দেওয়া যায়। এমনকি শুধুমাত্র শব্দ চয়নের ক্ষেত্রেও ছবিটির সাবলীলতাকে এতটুকু ক্ষুন্ন না করেও বিষয়ের গভীরে ঢুকতে বাধ্য করেছেন পরিচালক। বাংলা গানের মধ্যেই অনুপ্রবেশ ঘটে হিন্দি, ইংরেজি, তৎসম শব্দের , ‘কোর্মা কালিয়া পোলাও /জলদি লাও জলদি লাও’ কিংবা ‘গুড বাই, গুড বাই’ অথবা ‘মহারাজা, তোমারে সেলাম’। কোথাও একবারও দর্শকদের মনে হয়নি ‘এই ‘ শব্দটি ওই দৃশ্যে যায় না বরং ওই দৃশ্যের জন্য ‘এই শব্দই ‘ সবচেয়ে উপযুক্ত।

মনে রাখতে হবে গান এখানে ছবিটিকে বহন করে চলে, সহজ ভাষা, স্বাভাবিক ভঙ্গি, চিত্রকল্প সমর্থিত শব্দের ব্যবহার, কৌতুকের মোড়কে অনন্ত আনন্দের পরতে পরতে সুক্ষ চেতনার উন্মেষে প্রতিবাদের অস্ত্র হিসাবে (একই সঙ্গে সমাধানের পথদ্রষ্টা — যুদ্ধ করে করবি কী তা বল) ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ এবং ‘হীরক রাজার দেশে’ বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে চিরবন্দিত মাইলস্টোন। এ ছবি তো নিম্নবর্গীয় প্রলেতারিয়েত সমাজের প্রান্তীয় মানুষগুলির উত্তরণের ছবি। এই উত্তরণের পথে একমাত্র হাতিয়ার হলো ‘গান’। হাতের তালিতে রাজা হলেও তাদের মুখে থাকে ‘মোরা সাদা সিধা/মাটির মানুষ /দেশে দেশে যাই ‘অথবা ‘মোরা চলি, অনেক দেখে/অনেক শুনে, অনেক শিখে/কেটে গেছে মনের অন্ধকার’। গান আর তখন শুধু বিনোদন নয়, মনোরঞ্জন নয়, জ্ঞানার্জনের হাতিয়ারও বটে; নিজস্ব ভাষা প্রীতির মধ্যে দিয়ে সুক্ষ জাতীয়তাবোধের জাগরণ ‘মোদের নিজের ভাষা ভিন্ন/আর ভাষা জানা নাই,’ কিংবা মহারাজের সভায় গুপীর সেই মানবতার কণ্ঠস্বর ‘ উচা-নিচা ছোট-বড় সবাই সমান। আমরা দেখলাম সংলাপ কিভাবে সংগীতের মাধ্যমে অর্থবহ হয়ে ওঠে। সংগীত কিভাবে সমাজের নিম্নবর্গীয় মানুষগুলির মনের অন্ধকার দূর করে আলোয় ফেরার পথ দেখায়।

গুপির গানের সবচেয়ে বড়ো দুটি দিক হলো-শব্দ এবং সুর। প্রকৃতি, প্রতিবাদ, যুদ্ধ, রোমান্টিকতা, উপলব্ধি বা সমাধান সবই  সুরের অনুষঙ্গে শব্দ ব্যবহারের পরিমিত বোধে চিত্রকল্পে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। প্রকৃতি প্রেমে-‘দেখরে নয়ন মেলে’ কিংবা রাজার ভণ্ডামির বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে,‘অভাগারে ভাতে মেরে /আনে দেশে ঘোর অমঙ্গল’ অথবা যুদ্ধ সংক্রান্ত বিষয়ে ‘ওরে হাল্লা রাজার সেনা তোরা যুদ্ধ করে করবি কী তা বল?’। ভূতের রাজার থেকে বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারের বর পাওয়ার মতোই এই মৌলিক প্রশ্ন। উত্তরটা তিনিই দিয়ে দিচ্ছেন, ‘আধপেটা খেয়ে /বুঝি মরে ;মরে/যত ব্যাটা চলেছে সমরে/রাজ্যে রাজ্যে পরস্পরে/দ্বন্দ্বে অমঙ্গল’। যুদ্ধ,ক্ষমতার লোভ, ক্ষুধা, জীর্ণতা, রাজনীতি, শ্রেণী-দ্বন্দ্ব, ষড়যন্ত্র, অনায়সে স্থান পায় চলচ্চিত্রে যা একবারও মনে হয় না আরোপিত, বরং খুব স্বাভাবিক প্রবণতা বলে মনে হয় যা একটি স্বতন্ত্র ঘরানার জন্ম দেয়, এখানেই গুপির গানের অভিনবত্ব।

এহেন মিউজিক্যাল ট্রিটমেন্টে শুধু লিরিকের কথ্য ভাষা নিয়ে নয় কিছু অমার্জিত শব্দের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্য-তম্বিতাম্বা, অষ্টরম্ভা, মুন্ডু, পিন্ডি চটকে, পোলাপান (ছেলে পুলে নয়), জবর জবর (মজার মজার নয় কিন্তু), ভেগে পড়ি (পালিয়ে যাই নয়), যত কেরদানি, স্কন্ধ মটকে এই ধরণের গুরুচণ্ডালী বাক্যবন্ধের ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে যেমন চরিত্রগুলির স্বতঃস্ফূর্ততা বজায় থাকে তেমনি একটি বারের জন্যও গুপী-বাঘা তাদের ‘বেসিক সাব-অল্টার্ন রুট’ থেকে বিচ্যুত হয় না। পাশ্চাত্য সুরের সফিস্টিকেশন থেকে বেরিয়ে এসে গ্রাম্য অমার্জিত শব্দের সংযমী পরিসরে কখনো কাব্য গীতির আদলে নাটকীয়তা কিংবা কর্ণাটকি গায়কির সাথে লোকসংগীতের সুর বেঁধে দিয়ে রাগসঙ্গীতের এক স্বতন্ত্র চরিত্রে সোচ্চার হয়ে চলচ্চিত্রের শর্তে সংগীতকে তার নিজস্ব বাস্তববোধের জায়গায় স্থিত করেন পরিচালক।

পাঠক মনে করুন সেই দৃশ্যের কথা শুন্ডীর শুষ্ক মরুবালুর উপর দিয়ে চলমান ‘ওস্তাদের পালকি’ সামনে পিছনে তল্পি বাহকের দল। গায়কের কোনোদিকে নজর দেবার সময় নেই, পাল্কিও দুলছে ওস্তাদের শরীরও দুলছে ধ্রুপদী রাগ বিচ্ছুরিত সমগ্র মরু প্রান্তরে –রসানুভূতি থাক না থাক, ওস্তাদি কালোয়াতি চলবেই, বিশেষ তাৎপর্য্য পূর্ণ এই দৃশ্যটি পরিচালক অত্যন্ত সুচারু ভাবে অঙ্কন করেছেন। রুক্ষ প্রেক্ষাপটে যেন প্রাণহীন গানের দাপট। ক্লাসিক্যাল সংগীতের উন্নত রসসৃষ্টির বিপুল সম্ভাবনা এবং অন্তর্নিহিত শক্তি থাকা সত্ত্বেও তার ঐতিহ্যপূর্ণ সাত্ত্বিক ভাবটি আজ মর্যাদা হারিয়ে বিলুপ্তির পথে। গোঁড়া শাস্ত্রবাগীশ পন্ডিতদের নিরস শাস্ত্রের অনুশাসন, ঝাঁকিপূর্ণ কালোয়াতি গায়কীর কেরামতি এবং হৃদয়হীন তাল-তত্ত্বের কচকচানি ধ্রুপদ-ধামার প্রাচীন উচ্চাঙ্গ সংগীতরীতির গানের স্ফূর্তি ও সুরবিহারের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে তাকে ‘বিকলাঙ্গে’ পরিণত করেছে। সামাজিক পালা বদলে যেখানে ঘরানা প্রথাই চ্যালেঞ্জের মুখে সেখানে আমার ঘরানাই শ্রেষ্ঠ এ হেন অশৈল্পিক-অনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ‘দাপট’ কে গুপির গানের আবহে নিষ্পেষিত করেন পরিচালক প্রত্যেকটি ঘরানাকে তাদের উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে হাস্যকর করে তোলেন, রাজদরবারে ওই ‘দাপুটে’ গানের কালোয়াতি কসরতের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েন রাজামশাই।

মনে রাখা দরকার মিউজিক্যাল ট্রিটমেন্টের অভিনবত্ব, বাংলাদেশের কথ্য ভাষার সঙ্গে প্রচলিত লোকসংগীতের মেজাজ এবং গানের মাঝখানে সংলাপ প্রযোগ গুপির গানের শক্তিকে বাড়িয়ে দেয়। পাশ্চাত্য রীতির ইন্সট্রুমেন্টালাইজেশন, দোতারা বাঁশির পাশাপাশি সেতার কখনও কখনও দক্ষিণী কাঞ্জিরা-মিরচান, আবার বীণার মতো বনেদি যন্ত্রের ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে গানের ভাবনার অন্তরে প্রার্থিত ব্যাঞ্জনাকে প্রোথিত করে এক চিরন্তন ‘হৃদয়স্পর্শী জীবনমুখী’ ঘরানাকে প্রাসঙ্গিক করে তোলেন পরিচালক।

অধ্যাপক সৌমিক কান্তি ঘোষ

ভুতের নাচ এবং তার বাজনা, বোধকরি বাংলা চলচ্চিত্রের সাঙ্গীতিক আবহে ‘আন্টিথিসিসের’ প্রাসঙ্গিকতা মনে করায়। অর্থাৎ নাটকীয় মুহূর্তের ঝাঁঝ না থাকলেও সংগীত চিত্রকল্পের মূলভাবের অনুসারী হয় এবং প্রবল বৈপরীত্য তৈরির সম্ভবনাকে প্রশমিত করে। দক্ষিণী তালবাদ্যের অনুকরণে ভূতেদের নাচের সামগ্রিক আবহটি তৈরী করা হয়, যার পরিচিত নাম তালবাদ্য কচ্চেরি। প্রায় সাত মিনিটের এই নাচের উপস্থাপনায় ভূতেদের আখ্যান বর্ণিত হয়েছে। ভূতেদের আবির্ভাব, আনন্দ উচ্ছাস, পরস্পর বিরোধ, সংঘাত এবং পতন বা মৃত্যু। সামগ্রিক এই জীবনচক্রকে ধ্বনি -বিন্যাসের বৈচিত্র্যে বেঁধে ফেলেন পরিচালক। তিনি প্রথমেই কুলীন বাদ্য যন্ত্র ‘মৃদঙ্গম’ ধ্বনির সঙ্গে তাল মিলিয়ে পর্দায় এলিট ক্লাসের ভূতেদের হাজির করেন। এরপরই ধ্বনি হালকা হয় কঞ্জিরার (যা মূলত লোকসংগীতের যন্ত্র) সঙ্গে নাচতে থাকে কৃষক, শ্রমিক-মেহনতি শ্রেণীর ভূত। এর পরই ঘট্টম যন্ত্রটির ঘটাং ঘটাং শব্দের সঙ্গে পর্দায় সাহেব ভূতেদের দাপাদাপি শুরু হয়, বুট পরে দৌড়োদৌড়ী গুলি চালানো ইত্যাদি। তার পরই পর্দায় মোরসিং যন্ত্রের ব্যাঙ্গাত্মক শব্দের মধ্যে হাজির হয় ভুঁড়িওয়ালা, বেনিয়া, বামুন প্রভৃতি সমাজের অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ততায় স্থিত হওয়া ভুতগুলি। আসলে পুরো সমাজটাকেই জীবন্ত মানুষগুলির ছায়াকল্পে ভূতেদের আবহে একটি ফ্যান্টাসির পরিসরে আলোকিত করে সমগ্র ছবিটিকে ইতিহাসের পাতায় অন্তর্ভুক্ত করে ফেলেন পরিচালক। এ এমন একটি ছবি যেখানে ছবির মজা এবং গানের মজা পাশাপাশি থাকে শিল্প শর্ত মেনেই।

ভূত এখানে ভীতি প্রদর্শনকারী কোনও জীব নয় বরং সদর্থে সমর্থিত মানুষের বন্ধু। মানুষের রাজা গুপিকে তাড়িয়ে দিলেও ভূতের রাজার বরে সে শক্তিশালী হয়ে একটি কল্যাণকর রাষ্ট্রে প্রকৃত শাসকের কি ভূমিকা হওয়া উচিত তা প্রতিটা মুহূর্তে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। গান হয় তার প্রথম ও শেষ হাতিয়ার। অস্ত্র নয়, যুদ্ধ নয়, ক্ষুধা নয়, পরস্পর বিরোধ কিংবা দ্বন্দ্ব নয় শুধু গান, কথা, আনন্দ, মজা আর একটু পেট ভরে খাওয়া, এভাবেই হৃদয়ের সান্নিধ্য দিয়ে ‘মানুষ’ কে জয় করে গুপী গাইন।
মনে রাখতে হবে চলচ্চিত্রে সংগীতের বহুল ব্যবহার চলচ্চিত্রকে সংগীতবহুল বা গানবহুল করে তুলতো, এমনকি ‘মীরাবাঈ’ বৈজু বাওয়া ‘ঝনক ঝনক পায়েল বাজে’ অনেকটা সে রকমই। কিন্তু ওই সব ছবি কখনোই সংগীতকে আশ্রয় করে গতিময়তা বা বিন্যাস পায়নি বরং মূল চরিত্রের মুখে একাধিক গানের ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে ‘চরিত্রকে গ্লোরিফাই’ করা হয়েছে ‘ছবির সামগ্রিক বিষয়বস্তুকে নয়। অর্থাৎ চলচ্চিত্রের গঠনগত নান্দনিকতা কিভাবে সংগীতের দ্বারা ‘সংবদ্ধ’ ও ‘সংশ্লেষিত’ হতে পারে তা ‘গুপী গাইনের’ আগে ভারতীয় চলচ্চিত্র অবলোকন করেনি। প্রসঙ্গক্রমে,’সেন্টিমেন্টাল জার্নি ‘, ‘লাইফ অফ ওয়াগনার’, ‘আ সং টু রিমেম্বার’, বেঠোফেন; প্রভৃতির প্রভাব গুপী গাইনের আবহ কাঠামোয় লক্ষ্য করা যায়। আমরা সকলেই জানি পাশ্চাত্য সংগীতের উপর শ্রী রায়ের ঝোঁক এবং বোধ। বিঠোফেন ও মোৎসার্টে দীক্ষিত পরিচালকের হাত ধরে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মিশ্রনে যে অপূর্ব রসায়ন তৈরী হয় তারই ফলশ্রুতি হিসাবে বাংলা ছবি খুঁজে পেল সাঙ্গীতিক নান্দনিকতায় কম্পোজ হওয়া, ফ্যান্টাসির পরিসরে ‘ম্যাজিক্যাল সিনেমাটিক রিয়ালিটি’ গুপী গাইন বাঘা বাইন ‘ বাংলা তথা ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রথম, ‘ম্যাজিক্যাল মিউজিক্যাল কমেডি ‘।

অধ্যাপক সৌমিক কান্তি ঘোষ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here