গণতান্ত্রিক সমাজে গণমাধ্যমের ভুমিকা

  জীবনকে উপভোগ্য ও অর্থবহ করার ক্লান্তিহীন প্রচেষ্টার স্রোতে ভেসে মানবসভ্যতা সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে সৃষ্টির আদিলগ্ন থেকেই। সেই বিরামহীন প্রচেষ্টায় জনমানসে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে নাগরিকতাবোধ, জনমনে ক্রমশ দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হয়েছে সার্বভৌমত্বের ধারণা।

রাজতন্ত্র থেকে আধুনিক গণতন্ত্র- প্রবৃত্তিগত জোটবদ্ধতার অনুকূলে মানুষের নিরন্তর বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার এ এক পর্যায়ক্রমিক উত্তরণ। গণতন্ত্র বা সমাজতন্ত্র- আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নাগরিকের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক কাঠামো ক্রমাগত যুক্তিগ্রাহ্য, মানবিক ও শ্রেয়তর করার অব্যাহত প্রচেষ্টার মাঝেই নিহিত আছে সভ্যতার উৎকর্ষ সাধনে মানুষের চিরকালীন আকাঙ্ক্ষা।

আইন, বিচার ও শাসন বিভাগের পাশে যুক্ত হয়েছে গণমাধ্যম; যা কার্যত রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করেছে। গণতান্ত্রিক অনুশীলনের সংস্কৃতিতে যুক্ত করেছে নতুন মাত্রা, নতুন গতি।

গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়।গণতন্ত্র ও গণমাধ্যম শব্দ দুটির মধ্যে ‘গণ’ বা জনগণের অংশগ্রহণ বুৎপত্তিগতভাবেই নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত হয়ে আছে। আবার গণতন্ত্রের সঙ্গে গণমাধ্যমের এক ধরনের সমান্তরাল মিথষ্ক্রিয়াও কার্যকর। অর্থাৎ গণতন্ত্রের জন্য যেমন গণমাধ্যম দরকার, তেমনি গণমাধ্যমের আক্ষরিক অর্থে গণমাধ্যম হয়ে ওঠার জন্য দরকার গণতন্ত্রের সঠিক চর্চা।গণমাধ্যম একটি রাষ্ট্রের দর্পন স্বরূপ।তাই একটি রাষ্ট্রের উন্নতি,অগ্রগতি ও রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্য পূরণে  গণমাধ্যমের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।গণমাধ্যম সরকার এবং জনগণের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করে রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করে।

মুদ্রণ যন্ত্রের আবিষ্কার ইউরোপে নবজাগরণের সূচনা ঘটিয়েছে। উনিশ শতকে বিজ্ঞানের এ অর্জন সংবাদপত্রের ইতিবৃত্তে আধুনিকতার উদ্বোধন ঘটায়। চীনে হাতে লেখা খবরের কাগজের চল থাকলেও ইউরোপ-আমেরিকা এমনকি ভারতবর্ষেও সংবাদপত্রের আত্মপ্রকাশ ঘটে এ শতকেই।

সংস্কৃতি ও সভ্যতার বিকাশে সংবাদপত্র নতুন যুগের সূচনা ঘটায়। মানুষের ভাবনা, চিন্তা, ধর্ম, রাজনীতি, আদর্শের বাহনে পরিণত হয় এ প্রিন্ট মিডিয়া। ‘মুক্তচিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা’ শব্দবন্ধটি নতুন ব্যঞ্জনা লাভ করে।

ঔপনিবেশিক আমল এমনকি দেশ স্বাধীন হওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত সংবাদপত্রে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের প্রাধান্য সুস্পষ্ট ছিল। তবে এ কথাও সত্য যে, সরকার বা সরকারবিরোধী মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা বা জনমত সংগঠনে সংবাদপত্রের প্রচ্ছন্ন বা প্রবল ভূমিকা অনেক ক্ষেত্রে যুগ নির্ণায়কের ভূমিকা পালন করেছে।

সামগ্রিক জাতীয় অর্থনীতির উন্নয়নে দেশের প্রতিটি খাত কোন না কোন ভাবে প্রত্যেকের স্বহবস্থান থেকে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। কারন কোন একক বা একক খাতের উন্নয়নে একটা দেশের জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব না। দেশের সকল খাতের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে একটা দেশের জাতীয় অর্থনীতির পুরোপুরিভাবে পূর্ণাঙ্গতা লাভ করে থাকে। দেশের উন্নয়নের কথা বলতে গেলেই চলে আসবে গণমাধ্যমের কথা। উন্নয়ন ও গণমাধ্যম এ দুটি শব্দের উপস্থিতি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। একটি অপরটি ছাড়া ভারসাম্যহীন। গণতন্ত্র, সুশাসন ও উন্নয়নের সাথে গণমাধ্যমের নিবিড়তম সম্পর্ক রয়েছে। গণযোগাযোগ ও অবাধ তথ্যপ্রবাহকে উপেক্ষা করে জাতীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতি শুধুই কল্পনাবিলাস বৈ আর কিছু নয়। আর নিয়ন্ত্রিত  সংবাদ মাধ্যম কোন জাতির জন্য মোটেই ইতিবাচক নয়। সার্বিক দিক বিবেচনায় আধুনিক গণমাধ্যম রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। মূলত সংবাদপত্র আর সংবাদকর্মীর মাধ্যমে জনগণের আশা-আকঙ্খা, চাহিদা, জনমত সৃষ্টি ও সমাজের ভালোমন্দের প্রতিফলন ঘটে। তাই আধুনিককালে গণযোগাযোগ এবং সাংবাদিকতাকে উন্নয়ন ও অগ্রগতির প্রতিভুও বলা হয়।

একজন আত্মসচেতন ও বিবেকবান সংবাদকর্মী দেশ ও জাতির জন্য পথপ্রদর্শক। মূলত সংবাদকর্মীরা মানুষের আশা-আকাংখা, চাহিদা, প্রয়োজন ও স্বপ্নকে জাগিয়ে তোলার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করেন। গণমাধ্যম তার স্ফূরণ ঘটাতে সহায়ক হয়। আর তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব জনপ্রতিনিধি, সরকার বা রাষ্ট্রের। কোন অবহেলিত ও অনগ্রসর জনপদের সমস্যা, সম্ভাবনা ও প্রতিকার লেখনির মাধ্যমে চিহ্নিত করতে সংবাদকর্মী ও সংবাদপত্রে ভূমিকার গুরুত্ব উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

ভারতবর্ষের স্বাধীনতার ইতিহাসে  দি বেঙ্গল গেজেট,সংবাদ কৌমুদী,মিরাতুল আখবার, অমৃত বাজার পত্রিকা এবং দি হিন্দু এর মতো অনেক পত্রিকা কখনও মুক্তাঞ্চলে, কখনও প্রবাসে অবস্থান করে বিপ্লবী ও স্বাধীনতাকামী জনতাকে যেভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিল; উত্তাল মুক্তিকামী জনতাকে জাতীয়তাবাদী জনউচ্ছ্বাসে উদ্বেলিত করেছিল- তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

কেতাবি ধারণা বলে- একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা কতটা গণতান্ত্রিক, কতটা বিরুদ্ধমত সহনীয়, তা পরিমাপের মাপকাঠি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা। গণতান্ত্রিক চর্চাকে নিশ্চিত করতে হলে মতের বহুত্ব, পথের বিবিধতা, আচরণিক বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান দেখাতে হলে, গণমাধ্যমের মুক্ত ও নিরাপদ পরিসর অপরিহার্য। সমালোচনা বন্ধ হলে গণতন্ত্র সৌন্দর্য হারাবে, বিকল্প তথ্যপ্রবাহ চালু হওয়ার আশঙ্কা থেকে যাবে। তাই সরকার শুধু ভিন্নমতকে সহ্য করবে তা নয়, প্রতিস্পর্ধী কণ্ঠকে নিরাপত্তাও দেবে। গণতন্ত্রের এই প্রহরীকে (ওয়াচ্ ডগ) রক্ষা করা জীবন্ত (ভাইব্র্যান্ট) সমাজের অস্তিত্বের জন্য ভীষণ জরুরি। তবে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সামরিক, ধর্মভিত্তিক এমনকি গণতান্ত্রিক সরকারও কখনও কখনও মুক্তচিন্তার প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করেছে। অগণতান্ত্রিক চিন্তার বিকাশকে উৎসাহিত করেছে, ফ্যাসিস্ট শক্তিকে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। বর্তমান ভারতবর্ষ বিগত শতাব্দীর ৮০-র দশক থেকে তথ্যপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের অকল্পনীয় উন্নতির ফলে সংবাদপত্র, টিভি চ্যানেল ও রেডিওর মতো গতানুগতিক সংবাদমাধ্যমের পাশে জায়গা দখল করে নেয় সাইব্যারনেটিকস; গড়ে ওঠে বিশাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব, মেসেঞ্জার, ই-মেইলের মাধ্যমে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত সংযুক্ত হওয়া যায় এক লহমায়। শুধু শ্র“তিমাধ্যমে নয়, দৃশ্যমাধ্যমেও মানুষ মানুষের সঙ্গে যুক্ত।

সংযুক্তির এ অভিসার ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে যায় অবলীলায়, স্বচ্ছন্দে। কিন্তু বিজ্ঞানের এ অভূতপূর্ব অগ্রযাত্রায় বিপত্তি ঘটিয়ে ফেলে ফেক নিউজ কিংবা পোস্ট ট্রুথ-র আগ্রাসন। ডিজিটাল সংস্কৃতিতে যে কোনো মানুষ নিজের মতামত একটি কম্পিউটার এবং ইন্টারনেটের সাহায্যে প্রকাশ করতে পারে। সামাজিক মাধ্যমে প্রহরী বলে কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। মিথ্যার ওপর ভিত্তি করে সৃষ্ট মতামত, নিবন্ধও আপামর জনসাধারণের সামনে সত্যি বলে প্রমাণিত হয়েছে। কৃত্রিম সত্যের ধারণাটি হল- একটি অনভিপ্রেত পরিস্থিতি যেখানে প্রকৃত সত্যকে বাতিল করা হয় ও ব্যক্তিগত মতামত এবং আবেগনিষ্ঠ ধারণাকে প্রাধান্য দেয়া হয়।

এ পরিস্থিতিতে জনমতও এ আরোপিত সত্যের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে। সামাজিক মাধ্যমের নেতিবাচক এ শক্তি সমাজের ওপর ভয়ংকর প্রভাব ফেলে যার প্রভাব বর্তমান ভারতবর্ষে এক মারাত্মক ধ্বংসের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সত্যকে বিকৃত করে, এক শ্রেণির মানুষের বিশ্বাস ও সমষ্টিগত ধারণাকে বদলে দিয়ে পক্ষপাতদুষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা সহজ হয়ে যায়।

সাম্প্রতিক নিজামুদ্দিন মারকাজ কে কেন্দ্র করে কয়েকটি দৈনিকের উদ্দেশ্যমূলক সংবাদ প্রকাশ, ফেসবুকে মিথ্যা স্ট্যাটাস দিয়ে বিশেষ জাতির প্রতি বিদ্বেষ ছড়ান, ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃত সংবাদ পরিবেশন বা ফেক ছবি সুপার ইম্পোজ করার মতো সোশ্যাল মিডিয়ার নেতিবাচক সক্ষমতার এমন অনেক দৃষ্টান্ত এ সমাজে থেকে গেছে। পরিবর্তিত এ সামাজিক বাস্তবতা সমাজমননে মৌলিক কিছু কাঠামোগত পরিবর্তনের দাবি রাখে। ভুয়া খবরের মনস্তত্ত্বই হল পক্ষপাতদুষ্ট লক্ষ্যভেদ করে সমাজে ঘৃণা, বিদ্বেষ, বিভাজন সৃষ্টি বা দূরবর্তী কোনো উদ্দেশ্য অর্জন করা। সে কারণে যে পত্রিকা বা মিডিয়া সংবাদ পরিবেশন করে- তার ওপরই বর্তায় অপরিসীম দায়িত্ব মানুষকে শিক্ষিত করার, সংবেদনশীল করার; সজাগ রাখার।

তবে রহস্যময় মানবমনের অলিগলিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা টুকরো টুকরো প্রবৃত্তির সঙ্গে পরিচিত থাকাটাও জরুরি। আর প্রবৃত্তির এই তাড়নায় মানুষ এমন কিছু আচরণ করে, যা ব্যাখ্যাতীত। মানুষ সেই খবরগুলোকেই গ্রহণ করে, যা তারা গ্রহণ করতে চায়। এভাবে নিজেদের অজান্তে ও অগোছালো ভাবনার প্রশ্রয়ে গড়ে ওঠা মতামতকেই তারা পুষ্ট করে চলে নীরবে, নিভৃতে। নিজের আবেগের কাছে নিজের পরাজয়কেই নিত্য নিশ্চিত করে চলে। মানুষের জৈবিক প্রবণতার আরেকটি মজার দিক হল- পাঠক, বিশেষ করে বাঙালি পাঠক বা শ্রোতা অনেকেই বস্তুমুখী সৎ খবর পছন্দ করে না। নিজের পছন্দের কাগজ থেকে নিজ মতাদর্শ সমর্থনের পাথেয় জোগাড় করে নেয়। কোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে ন্যারেটিভ কী হবে, তা বিভিন্ন গোষ্ঠী তাদের নিজস্ব ধারণা, মত ও গোষ্ঠীস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েই তৈরি করতে চায়। বিশ্লেষণ বস্তুনিষ্ঠ হলেও মতের মিল না ঘটলে পাঠক তাকে প্রত্যাখ্যান করে।ইতোমধ্যে এমন সব বিপদ দেখা যাচ্ছে, যা সহজে বোঝা যায় না৷ তার মধ্যে সবার আগে রয়েছে ইন্টারনেটের ভাইরাল কাঠামো৷ মানুষ এবং ইদানীংকালে আরো বেশি যন্ত্র মিথ্যা, কারচুপি করা ভিডিও ও ছবি ছড়িয়ে দিচ্ছে৷ সুপরিকল্পিতভাবে জনমত প্রভাবিত করাই এর উদ্দেশ্য৷ ‘ফেক নিউজ’, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিথ্যা ছড়ানোর অভিযান, অপবাদ ও হুমকি দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ হয়ে উঠেছে৷ আনাড়ি লোকের কাঁচা কাজ নয়, বরং পেশাদারি সংবাদমাধ্যমও আরো বেশি করে এমন কাজ করছে৷

এখানেই চ্যালেঞ্জ এসে যায় নিরপেক্ষ গণমাধ্যমের টিকে থাকার প্রশ্নে। একদিকে প্রিন্ট উপকরণের ব্যয়বৃদ্ধি, সংকুচিত বিজ্ঞাপনের বাজার অথবা সোশ্যাল মিডিয়ার পপুলিস্ট উল্লম্ফন। অন্যদিকে, সাংবাদিকতার পেশাগত নৈতিকতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও দায়িত্বশীলতার মতো উচ্চমার্গীয় মূল্যবোধকে আঁকড়ে থাকার চ্যালেঞ্জ। এ পরিস্থিতিতে সস্তা জনপ্রিয়তা বা মুনাফার আশায় পত্রিকা বা মিডিয়া গুলি আপস বা সমঝোতা করলে সমষ্টিগত ধারণার গতিমুখ পাল্টে যায়। এক পর্যায়ে পাঠক বা দর্শক বস্তুনিষ্ঠতার অভাবে পত্রিকা পাঠে বা খবরে আগ্রহ হারায়। সমাজের তাতে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হয়ে যায়। পরিস্থিতিকে সামাল দেয়া রাষ্ট্রের জন্যও তখন কঠিন হয়ে পড়ে।

গণমাধ্যম, গণতন্ত্র ও বিদ্যমান সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে যখন আলোচনা করছি, ঠিক তখনই দেশের এমন বাস্তবতায় প্রিন্ট মিডিয়া সহ ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া কার্যত নিষ্প্রভ, কোণঠাসা। টি আর পি,পাঠক সংখ্যা বা দর্শক বৃদ্ধি,মালিকানা এবং সর্বোপরি মুনাফা অর্জন গণমাধ্যম গুলিকে তার আদর্শ থেকে বিচ্যুত করেছে,ফল  স্বরূপ সত্যান্বেষী মাধ্যম হিসাবে বিশ্বজনীন ক্ষেত্র ভারতীয় গণমাধ্যম গুলির স্থান ক্রমশই  দেশে এখন সংবাদপত্রের আকার বর্ধনশীল। তবে গুণে-মানে শীর্ষ জাতীয় দৈনিক হাতেগোনা কয়েকটি। বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখে একটি গণমাধ্যম এর সগৌরবে টিকে থাকার নজিরও এ দেশে খুব বেশি নেই। তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে নিজের প্রাসঙ্গিকতা বজায় রেখে চলা, পেশাদারিত্ব প্রমাণ করা এবং জনমানসে নিরপেক্ষতার ধারণাকে বাঁচিয়ে রাখা যথেষ্ট কষ্টসাধ্য বিষয়। বিশেষ করে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণে, নানা মাত্রায়, মুক্তমনে, নির্মোহ দৃষ্টিতে কোনো বিষয়কে বিশ্লেষণ করার সততা, সাহস ও পেশাদারিত্ব গণমাধ্যম গুলি হারিয়ে ফেলছে অন্তত এমন ধারণা পোষণ করার যথেষ্ট যুক্তি আছে বলেই মনে হয়।

নিরপেক্ষতার ধারণা আপেক্ষিক এবং তা বিভিন্ন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শ্রেণিভিত্তিক সূচকের ওপর নির্ভরশীল। নৈতিক দৃঢ়তা ও সত্যের সঙ্গে নিবিড় সখ্যই তথ্য পরিবেশনে নিরপেক্ষ মান অর্জনে নিয়ামক ভূমিকা পালন করতে পারে। এ নৈতিক স্থিতি সহজবোধ্য; কারণ যে ঘটনাকে ভিত্তি করে সংবাদ প্রকাশ করা হয়, তাকে স্থায়ীভাবে আড়াল করা সম্ভব নয়। কিন্তু সংবাদ উপস্থাপন, অগ্রাধিকার নিরূপণ, গুরুত্ব আরোপ বা নিউজ আইটেম বাছাই করার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে পত্রিকার বা মিডিয়ার নীতিগত কৌশল; সততা কিংবা দায়িত্বশীলতার অঙ্গীকার। এই কাজটি বর্তমান আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় সহজ নয়।

যেখান থেকে শুরু করেছিলাম লেখাটি। গণমাধ্যমের দায়িত্বশীলতা। প্রথম ভাবনা, সমাজে গণমাধ্যমের ভূমিকা কি? গণতান্ত্রিক সমাজে গণমাধ্যম নাগরিকের অধিকার রক্ষা করতে ভূমিকা রাখে তথ্য জগতে তার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করে। মানুষ জানতে চায়, মানুষ সমাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে চায়। আর সেখানেই গণমাধ্যমের ভূমিকা। নীতিনির্ধারক, আইনসভাসহ রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গের সাথে মানুষের যোগাযোগ ঘটাতে ভূমিকা রাখে গণমাধ্যম। ভারতবর্ষে তথা বিশ্বে গণমাধ্যম নানা ঐতিহাসিক ঘটনায়, মানুষের অধিকার রক্ষায় সচেষ্ট থেকেছে। দুর্নীতি, সহিংসতার ইস্যুকে অনেক সময় গণমাধ্যমই সবার আগে মানুষের কাছে নিয়েএসেছে।

ভারতবর্ষের গণমাধ্যমের প্রথম সমস্যা তার রাজনীতিকিকরণ। যেভাবে রাজনীতি ঢুকেছে এই পেশায়, এতে, বস্তুনিষ্ঠতা নানাভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক সংবাদ প্রতিষ্ঠানেরই এখন দর্শক-শ্রোতার কাছে সেইভাবে গ্রহণযোগ্যতা নেই, নেই বিশ্বাসযোগ্যতা। আর গণমাধ্যমের মালিকানার ধরনও একটা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এর স্বাধীনতার জন্য। তাদের স্বার্থের দ্বন্দ্বে কমে গেছে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, বেড়েছে চাঞ্চল্য করার প্রবণতা। রাজনীতি এতোটাই প্রভাব বিস্তা করে যে অনেক বড় ঘটনাও কোনো পত্রিকা বা টেলিভিশনে আসে না। ২০১৪-এর নির্বাচনের পর থেকে সারাদেশে সংখ্যালঘু(আর্থ-সামাজিক) সম্প্রদায়ের ওপর যে ভয়াবহ আক্রমণ, খাপ পঞ্চায়েত এর নামে নারী নির্যাতন,বেকারত্বের পরিসংখ্যান এবং সর্বোপরি মানবতা বিরোধী কার্যকলাপ সংঘটিত হচ্ছে তা কখনোই কোনো কাগজে বা টেলিভিশনে নীরপেক্ষ প্রকাশ বা প্রচারিত হয়নি আসলে সরকার, বা বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর চাপে তা প্রকাশ বা প্রচার হয়নি, বা করতে দেয়া হয়নি এবং হলেও তা সাময়িক যৎসামান্য। এবং এমন একটি সেন্সরশিপের জন্য সাংবাদিক ইউনিয়ন থেকে কোনো প্রতিবাদও করা হয়না।প্রশ্ন আসে, যদি স্বাধীনতাই না থাকলো, তা হলে এতো এতো চ্যানেল, রেডিও, পত্রিকা, সাময়িকী, অনলাইন নিউজ সাইট হচ্ছে কেন? হচ্ছে, কারণ মিডিয়া যে কারো কারো জন্য একধরনের অস্ত্রও বটে।
এই স্বাধীনতা কি কখনো কখনো অতি স্বাধীনতায় বা দায়িত্বহীনতায় পরিণত হয়? হয় বৈ কি, যদি সেই সংবাদ প্রতিষ্ঠানে একটি লিখিত আচরণবিধি না থাকে, যদি সাংবাদিকরা সঠিকভাবে প্রশিক্ষিত না হয়। তবে, এই ভয়ে সাংবাদিকতা বন্ধ করে দেয়া যায় না। কোনোভাবেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করা যাবে না।

গণমাধ্যম কর্মীদের এই রাজনৈতিক বিভাজন একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। এই বিভক্তির ফলে সরকারি বা বেসরকারি, কিংবা গোষ্ঠীগত চাপ, কিংবা হমকি, কোনো ক্ষেত্রেই কোনো ভূমিকা নিতে পারছে না সাংবাদিকরা।

আসলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য দরকার নিজের ভূমিকার প্রতি গণমাধ্যম কর্মীদের আস্তা রাখা, দলীয় কর্মীর মতো আচরণ না করা। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান, এমনকি সাংবাদিক ইউনিয়নগুলোর উচিত একটা নিজস্ব আচরণবিধি তৈরি করে সে পথে চলা।

ইংরেজ ঐতিহাসিক, রাজনীতিক ও লেখক লর্ড অ্যাকটন (John Emerich Edward Dalberg-Acton) ইংল্যান্ডের প্রথম ব্যারন অ্যাকটন) একবার এক ধর্মযাজকের কাছে লেখা চিঠিতে বলেছিলেন, ক্ষমতার চরিত্রই হলো দুর্নীতিপ্রবণ; ক্ষমতা যত বেশি, দুর্নীতির প্রবণতাও তত বেশি (Power tends to corrupt, and absolute power corrupts absolutely) গণমাধ্যমের ব্যাপ্তি ও জনগণকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা সীমাহীন বললে অত্যুক্তি হবে না। তাই আইন, বিচার ও প্রশাসন এই তিনের বাইরে সাংবাদিকতাকে রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ (fourth estate) বা চতুর্থ ক্ষমতা (ক্ষমতাধর প্রতিষ্ঠান অর্থে) হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ কারণে সাংবাদিকরা দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবেন এটাই কাম্য। বিশ্বজুড়ে বলা হচ্ছে, গণমাধ্যমই পারে একটি দেশের গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখতে। এ জন্য গণমাধ্যমের কেবল স্বাধীনতাই নয়, প্রয়োজন রয়েছে দায়িত্বশীলতারও।

কাজেই সাংবাদিকের লেখার এবং উপস্থাপনের ক্ষমতা কেবল জনগণের কল্যাণেই ব্যবহার করতে হবে, সাংবাদিকের নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থে নয়। ‘ক্ষমতার দাপটে’ দুর্নীতিপরায়ণ হয়ে না উঠে গণমাধ্যম ও এর কর্মীদের ভাবতে হবে, তিনি জনগণের সেবায় নিয়োজিত। একজন সাংবাদিক এ কথা মনে-প্রাণে ধারণ করলেই কেবল দেশ ও দশের কল্যাণ সম্ভব।

 

লেখকঃ আলমাস আল ইসলাম (বিশিষ্ট কলামিস্ট)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here