মহামারী -দুর্ভিক্ষ- সমাপতনের প্রাসঙ্গিকতা

   চিত্রকলায় পিকাসোর কোলাজ, সাহিত্যে ল্যাটিন আমেরিকার ম্যাজিক রিয়ালিজম ও বার্বারিজম , চলচ্চিত্রে নবতরঙ্গ বা গোদারের বিশ্বজয় প্রমান করেছিলো বুর্জোয়া হাই আর্ট এর সমাপ্তি একই সঙ্গে রাষ্ট্রকে রি-ডিফাইন  করার সামাজিক উৎস হিসাবে উঠে এসেছিলো  সমাপতন ও মেলোড্রামার আঙ্গিকগত প্রাসঙ্গিকতা। যার শুরু সেই ষাটের দশক থেকেই।

ধান ভাঙতে শিবের গাজন কেন ? না , সুধী পাঠক কে শুধু মনে করাতে চাই  বর্তমানের প্রেক্ষিতে অতীত ইতিহাসের ঘটে যাওয়ার সেই সময়কালকে।

মনে করে দেখুন , দেশভাগ ও দাঙ্গা , মহামারী ও দুর্ভিক্ষ , করোনা ও আম্ফান কিংবা উত্তর ভারতে করোনা ও তাপপ্রবাহ ,  শস্যহানি ও পঙ্গপাল , কোনোটাই আশ্চর্য সমাপতনের গল্প নয় বরং বাস্তবিকই সমাপতন  (a remarkable concurrence of events or circumstances without aparent casual connection).

আসলে একটা জিনিস বুঝতে হবে। সভ্যতার বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চেতনার এবং সেই চেতনার সঙ্গে আরও বেশি করে মানুষকে একীভূত করার প্রয়াস থেকেই রিয়ালিজম অফ হাই আর্ট এর সমাপ্তি ঘোষিত হয় আর উদ্ভব হয় ফোক আর্টের।যেখানে সাধারণ মানুষ সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। তাদের জীবনের দৈনন্দিন বাতাবরণে বহিঃপ্রকাশিত  হলো তথাকথিত লোকসংস্কৃতি। জল ,বৃষ্টি ,কাদা আর অভিবাসী শ্রমিকদের পায়ে পায়ে উঠে এলো সমাজ – সংস্কৃতি ,রাষ্ট্রশক্তি -লোক ডাউন , মহামারী -দুর্ভিক্ষ কিংবা করোনা -অনাহারের মতো সমাপতনের সরলরৈখিক আখ্যান। হঠাৎ করে  নয়।ঘটনার পরম্পরায় এর চলন স্বাভাবিকই ছিল। শুধু সময়ের অপেক্ষা। পাঠক মনে করে দেখুন সীতার লক ডাউনে যখন কুটিরে সীতা একা তখন রাবনের এন্ট্রি কি অস্বাভাবিক ?  বরং যথাযথ।  এই সমাপতন ই  মহাকাব্যের আঙ্গিক তৈরী করে ( এপিক ফর্ম ). ঠিক একই ভাবে দ্রৌপদীর বস্ত্র হরণের চূড়ান্ত পর্যায়ে হাজির হয় স্বয়ং শ্রী কৃষ্ণ। এর চেয়ে বড় সমাপতন আর কিছু হতে পারে ? তাই বার বার আমরা ফিরে যাই মহাকাব্য গুলির আর্কিটাইপাল কন্সেপ্টে। ঠিক এ ভাবেই শস্যহানির সঙ্গে পঙ্গপালের কিংবা অম্ফানের সঙ্গে অদৃষ্ট নিয়তির সম্পর্ক  প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।  সেখানে গেলেই পরিষ্কার হয় আয়লা থেকে আম্ফান মধ্যবর্তি সময়ে এই বাসা হারা গলা জলে দাঁড়িয়ে শুন্য থালা বাড়িয়ে দেওয়া মানুষগুলির প্রতি রাষ্ট্র বা সরকার কতটা সচেতন ছিলো।

আসলে সমাপতন সময় কালের সঙ্গে ইতিহাসকে মিলিয়ে দেয়। যিনি দেশভাগের আগে ছিলেন স্কুল মাস্টার মাত্র কয়েকদিন পরেই পরিণত হয়েছেন ঠিকা শ্রমিকে। একই ভাবে লক ডাউন পরবর্তী সময়ে অনেকেই  মধ্যবিত্ত জীবনের গন্ডি থেকে খসে পড়েছেন অতি নিম্নবিত্তের রুক্ষ বাস্তবের নগরজীবনে। এর পিছনে কোনো রিয়ালিজম বা যুক্তির পারম্পর্য নেই। যা আছে তা হলো ভ্রান্ত রাজনীতির ফলে উৎপন্ন সমাপতনের ঘটনা।

 অধ্যাপক সৌমিক কান্তি ঘোষ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here