রাজেশ মল্লিক,এক বিরল যোদ্ধা!

আজকে আপনারা শুনবেন রাজেশ মল্লিকের কথা। বর্ধমানের ক্ষেতিয়া গ্রামের এক লড়াকু যুবক রাজেশ। দারিদ্রের ভ্রুকুটি অগ্রাহ্য করে এগিয়ে চলেছে রাজেশ এবং তার টিম।

১)আপনার ছোট বেলার দিনগুলো সম্পর্কে কিছু বলুন।পরিবারের কথা,বন্ধুদের কথা।

আমার ছোটবেলাটা মায়ের আঁচলের তলায় কেটেছে। বাবার ছোট্ট একটা চায়ের দোকান ছিল। আমাদের ছিলো যৌথ পরিবার।  মা,বাবা, দাদা, জ্যাঠা, জ্যেঠিমা, কাকা, কাকিমা ও খুড়তুতো ভাই ও বোনের সাথে বেশ মজাতেই কেটেছে আমার  ছোট বেলা।আমি ছোটতে খুব ঘরকুনো ছিলাম। বাড়িতেই খেলাধুলা করতে ভালোবাসতাম।

আমার বয়স যখন ৮ বছর, তখন আমার পর পর দুটো চোখে ছানি অপারেশন হয়। ফলে হাই পাওয়ারের চশমা পড়া বাধ্যতামূলক ছিলো। তার ওপরে আমি  ছিলাম খুবই রুগ্ন। ফলে ছোটবেলায়  পাড়ার বন্ধুরা খুব একটা পাত্তা দিত না।পরে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পড়ার সময় আমার বন্ধু ভাগ্য খুলে যায়।

যাই হোক আমার বয়স যখন ১২ বছর আমার মা পারিবারিক সমস্যার কারণে আমাকে ও আমার দাদাকে নিয়ে মামার বাড়ি চলে যায়। আমার ও দাদার পড়াশুনার খরচ চালানোর জন্য মা বর্ধমান শহরে গৃহ পরিচারিকার কাজ শুরু করে। আমি যখন ক্লাস ইলেভেনে পড়ি তখন আমি ও আমার মা ক্ষেতিয়ার বাড়িতে ফেরত আসি। ওই সময়ে জমি চাষ করে, টিউশন পড়িয়ে,সবজির দোকান চালিয়ে আমি উচ্চমাধ্যমিক পাশ করি। এর পর বাবা মারা যান। ফলে আরও  আর্থিক সমস্যায় পড়ে যাই। তখন আমি এক কম্পানির সেলসের কাজে শিলিগুড়ি চলে যাই। পরে একবছর পর ফিরে এসে আমার কলেজের পড়াশুনা ফের শুরু করি।

২)স্কুল,কলেজ কোথায়? সেই সব বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ আছে?

আমার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় ক্ষেতিয়া অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে। পরে ক্ষেতিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করি এবং আমি স্নাতক হই বর্ধমানের বিবেকানন্দ মহাবিদ্যালয় থেকে।কলেজের তেমন কোনো বন্ধুর সাথে যোগাযোগ না থাকলেও স্কুলের অনেকে বন্ধুর সাথেই যোগাযোগ আছে।

৩) কোয়েস্ট ফর লাইফের সাথে  যোগাযোগ কিভাবে?

আমার এক বন্ধু সুলতান মামুদকে AB নেগেটিভ রক্তের অভাবে মারা যেতে দেখেছিলাম কলকাতার পিজি হসপিটালে। আমরা সব বন্ধুরা চেষ্টা করেও সময় মতো রক্ত যোগাড় করতে পারিনি। ফলে তখন থেকে মাথায় ঘুরতে থাকে কিছু একটা করতে হবে এই সমস্যা সমাধানের জন্য। তখন আমার সাথে আলাপ হয় সেখ সাহেবুল হকের ।ওর মাধ্যমেই পরিচয় কোয়েস্ট ফর লাইফ টিমের। যারা তখন রক্ত দান আন্দোলনে নামছে। আমিও কোয়েস্ট সাথে যুক্ত হয়ে নেমে পড়ি এই কাজে।

৪)জীবনের সাফল্য বলতে আপনি কি বোঝেন? সফলতা মানে কি ভালো চাকরি,বাড়ি,গাড়ি?

আমার কাছে সফলতা মানে ভালো চাকরি,বাড়ি,গাড়ি একেবারেই নয়। আমি আমার এক প্রতিবন্ধী বন্ধুর পড়ার বিষয়ে সাহায্য করার কথা দিয়েছিলাম। আমার সেই বন্ধু হাঁটতে পারে না, হামাগুড়ি দিয়ে চলে।উচ্চমাধ্যমিকের পর পড়া ছেড়ে সেলাই মেশিনের কাজ শিখছিল। তাকে আমি জোর করে কলেজে ভর্তি করাই এবং পরবর্তী সময়ে বর্ধমান ইউনির্ভাসিটিতে। সেই বন্ধু এখন M.A, B,ED করে ফেলেছে। এটাই আমার সফলতা বলে মনে করি। আর সব থেকে বড় সফলতা হল অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটানো।

 

৫) রাজনীতি করার ইচ্ছা আছে?

রাজনীতি করতে কখনো কখনো  ইচ্ছা হয়। যখন দেখি অসহায় স্বামী পরিত্যক্তা মহিলা ভিক্ষা করে খাচ্ছেন দুই ছেলে নিয়ে, অথচ পঞ্চয়েতের রাজনৈতিক নেতারা ঠিক করে তার রেশন কার্ডটা করে দিচ্ছে না। বা যখন ভিন্ন রাজনৈতিক দল করার অপরাধে গরীব মানুষ রেশন কার্ড পাচ্ছে না,এমন কি সরকারি টয়লেট নির্মান করার সুবিধা পাচ্ছে না, তখন মনে হয় ওদের হকটা পাইয়ে দেওয়ার জন্য রাজনীতি করি। কিন্তু রাজনীতি নামক নোংরা খেলায় নামতে বড্ড গা ঘিন ঘিন করে। তাই প্রশাসনিক যোগাযোগ কে ব্যবহার করে যতটা করা সম্ভব করার চেষ্টা করি।

৬)করোনা সংক্রমণের ভয়ে যেখানে মানুষ অন্যের ছোঁয়াও এড়াতে চাইছে, সেখানে আপনারা স্বেচ্ছায় মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছেন। মরার ভয় পাচ্ছেন না?

করোনা সংকটে মানুষের দুর্গতির ছবি কিছুটা হলেও চোখের সামনে থেকে দেখছি। আমার এলাকার মানুষ যেন কোনো অসুবিধায় না পরে তার জন্য সামান্য চেষ্টা করে চলেছি মাত্র। আসল কথাটা হলো মৃত্যু ভয়ের থেকেও বেশি ভয় পাই আমার এলাকায় যদি কেউ অর্ধহারে বা অনাহারে থাকে।তাই সাবধানতা অবলম্বন করে মৃত্যু ভয় কে জয় করার চেষ্টা করছি।

 

৭) প্রেম করেন? প্রেমিকা/স্ত্রী আপনার এই ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর অভ্যাস মেনে না নিলে কি করবেন?

বর্তমানে কোনো প্রেমিকা নেই, তবে ভালো লাগা আছে। আর যাকে ভালো লাগে সেও অল্প বিস্তর ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়িয়ে  বেড়ায়। তবে আশা রাখি আমার সঙ্গে যে ঘর করবে সেও আমার সমমনস্কই হবে।

 

৮)আগামী দিনে কাজের কি পরিকল্পনা?

রক্তদান আন্দোলন নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা আছে। তবে রক্তদান আন্দোলনে এখনও আমি শিক্ষানবিশ।রক্তদান আন্দোলনের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা দুর করার পরিকল্পনা রয়েছে।

 

৯) একদিনের জন্য প্রধানমন্ত্রী করা হলে কি কি করতে চাইবেন?

 

এটা কখনো ভাবিনি।ত বে আমি প্রধানমন্ত্রী হলে আমার মন্ত্রী পরিষদে বাদশা, শান্তনু, রাজীব, শাজাহান, সোলেমান, সাইফুল, মিকু কে দরকার । কারণ আমি টিম গেমে বিশ্বাসী। আমি মনে করি আমার টীম যদি আমাকে যোগ্য সঙ্গত না দিত তাহলে  কোনো কাজই করা সম্ভব ছিল না। যদি প্রধানমন্ত্রী করা হয় তাহলে আইন করে সরকারের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে খরচ বাড়াবো আর সামরিক খাতে খরচ কমাবো। এবং এই আইন যেন কেউ চেঞ্জ না করতে পারে তার জন্য এই আইনকে সংবিধানের বেসিক স্টাকচারের মধ্যে নিয়ে আসবো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here