প্যানডেমিক এবং ভালোবাসার মানুষেরা

   

নিজেকে আমি মুক্তমনার দলে রাখি। পদবী ব্যাবহার করবোনা বলে ক্যাত মেরে একসময় ফেসবুকে নিজের নাম লিখেছিলাম “মানুষ তানিয়া”। এরপর ২০১৪ সালে ভারতে মোদিওয়েভ এলো।

ক্রমে চারপাশটা কেমন বদলে যাতে লাগলো। (নাকি বলবো চারপাশ নিজের মুখোশগুলো খুলে ফেলতে শুরু করলো।) আমিও ধীরে ধীরে বদলে যেতে লাগলাম।যেনো মুক্ত বিহঙ্গ আমি ডানা গুটিয়ে ক্রমে বর্ম পরে নিতে শুরু করলাম। নেটদুনিয়াও দখলদারি চললো। সরকারের সমালোচনা করলেই মাস রিপোর্টিং। এরই জেরে  মানুষ তানিয়া নামও পাল্টে পদবীসহ নাম ব্যবহার করতে বাধ্য করলো ফেসবুক। লাভ জিহাদ, ঘরওয়াপসি, গোদি মিডিয়া ইত্যাদি নানা অদ্ভুতুড়ে শব্দ আমাদের রোজনামচায় জায়গায় করে নিতে লাগলো। বাকীটা ইতহাস। আজ আলম এমন হয়েছে যে রোগেরও ধর্ম নির্ণয়  করা হচ্ছে। এসময়ে দাঁড়িয়ে একটি মহামারীর মোকাবেলা করা। কিন্তু মোকাবিলাত করতেই হবে। তাই বর্ম খানা জড়িয়ে বের হতেই হয়। সেই  কাজে করতে গিয়ে আশপাশটাকে আবার নতুন করে চিনতে পারছি। তারই অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে এই লেখা। কিছুটা আত্মপ্রচারের দোষে দোষী হয়ে যেতে পারি এমন একটি রিস্ক নিয়েই এই লেখাটা লিখছি।

লকডাউনের প্রথমদিন থেকেই ভয়টা চেপে বসে ছিলো। বুঝতে পারছিলাম খাদ্যের জন্য  হাহাকার শুরু হতে বেশি দিন লাগবেনা। হলোও তাই।দু একদিনের মধ্যেই আশঙ্কা সত্য প্রমাণিত হতে লাগলো। তখন থেকেই মানুষের পাশে থাকার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলাম। না হয়েও উপায় ছিলো না কারণ সবসময়ই কিছু ঘামের ছোপ থাকা হাফহাতা  শার্ট পরা পেটে ঘামছা বাঁধা কিংবা পরিষ্কার করে কাচা পুরনো শাড়ি পরা চেহরা ঘুমাতে দিচ্ছিলো না। ত বন্ধুবান্ধবদের সাহায্য আর বিশ্বাসের ফলে অল্প টাকা-পয়সা জোগাড় করে চালডাল নিয়ে বেরিয়ে পড়া গেলো। ভরাপেটে ভুখা মানুষের চোখের দিকে তাকালে যে কি ধরনের পাপবোধ হয় সেটা তখনই অনুভব করলাম। এরচেয়ে বেশি অনুভাব করলাম আত্মসম্মান আর আত্মতুষ্টি কি জিনিস।

এক বৃদ্ধ করুন সুন্দর চোখে তাকাচ্ছিলেন। উনার চাউনিটা বুকে কেমন একটা বিঁধ ছিলো। সামনে  পাশের বাড়ির একছেলে দা হাতে কি একটা করছিলো। আমরা ফর্দ মিলিয়ে বৃদ্ধকে জিনিস দিয়ে মহানুভবমতো মুখ করে বেরিয়ে আসছি। হঠাৎ দা-হাতে পুরুষ যেন আপনমনেই বললেন আসলে খুব কষ্ট বুঝলেন ত এসময়ে কারুরই রুজিরোজগার নেই ত।কথাটা কেমন যেনো আর্তির মতো শুনালো। আমরা চলে আসছিলাম। হঠাৎ একজন বললো  একস্ট্রা কিছু আছে উনাকেও দিয়ে দেওয়া যেতো। ওমনি ব্যাগ নিয়ে এগিয়ে গেলাম। দেখি, মাটির বারান্দায় বসে চাল আর ডালগুলো ভাগ করে নেওয়া হচ্ছে দুটি পরিবারের মধ্যে। চুপচাপ ব্যাগটা রেখে চলে এলাম।

জানিনা এটা সুন্দর ছিলো নাকি আমার “প্রিভিলেইজড রোমান্টেসাইজেশন”  চোখের কোনটা জ্বালা করে উঠলো। আবার বুঝতে  পারলাম এরা এভাবেই বাঁচেন। সুমদ্রঝড়ে ফেসে যাওয়া জাহাজের যাত্রীদের মতো। একে ওপরকে জড়িয়ে। কিছুক্ষণ পর এক পরিচিত জনের সাথে দেখা। তিনি বললেন আরেক প্রতিবেশীর কথা। খুব কষ্টে আছেন। আবার একস্ট্রা প্যাকেট খুঁজলাম। তিনি তখন ফোন করলেন বন্ধুকে। যা বুঝা গেলো ওপাশের জন একটু দূরে কোথাও  গেছেন। আমরা বাবুবিবিদের সময় খুব দামী ত, তাই একজন বলেই ফেললেন উনাকে বলুন অল্প তাড়াতাড়ি  আসতে। কথাটা পৌছে গেলো ওপাশে। ওমনি চার পাঁচ মিনিটের মধ্যেই সেই হাড়ঝিরঝিরে মাঝবয়েসী এসে  হাজির। খুব হাঁপাচ্ছেন। অন্তত ১৫ মিনিটের রাস্তা ৫ মিনিটে দৌড়ে পেরিয়ে এলেন।দেখেই মনে হচ্ছে সকাল  থেকেই পেটে তেমন কিছু পড়েনি। নিজের উপর আবার আরেকবার ঘেন্না হলো। কি দরকার ছিলো উনাকে তাড়া দেওয়ার। যাহোক তিনি খাদ্যের টোপলা হাতে চলে গেলেন। হঠাৎ মনে পড়লো যিনি খবর দিলেন আর যিনি সাহায্য নিলেন তাদের দুজনের ধর্ম এক নয়। আসল পৃথিবীতে মানুষ এভাবেই বাচে। একে ওপরের সুখ দুঃখের ভাগীদার হয়ে। অথচ সেই পৃথিবী ছেড়ে যখন ভার্চুয়াল জগতে ফিরি সেখানে চিত্রটাই আলাদা। আমার নামের সাথে যুক্ত ধর্মীয় পরিচয়ের জন্য সেখানে আমি অপরাধী। কোথায় কোন মর্কজে কারা কিসব করছে নাকি করছেনা  সেগুলোর জন্য আমাকে জবাবদিহি করতে হচ্ছে। আর দুঃখের বিষয় হলো এই ভার্চুয়াল জগত ধীরে ধীরে ছেয়ে ফেলছে  আশপাশটা। ফেসবুক আর হোয়াটস্যাপে দেওয়া ঘৃণা আর প্রতিপক্ষ নির্মাণের রাজনীতি পৌঁছে যাচ্ছে ঘরে ঘরে।

এ কথাটাও এই সময়ে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনায় আরোও ভালো করে উপলব্ধি করলাম।

আমাদের পাশের একটি চা-বাগান। সেখানে আমাদের অনেক ভালোবাসার মানুষেরা থাকেন। তারা হাজারো কষ্টের মধ্যে আদিবাসীমানুষদের নিয়ে গান করেন, নাটক করেন। একসময় সেখানে গিয়ে বাচ্ছাদের ফ্রী কোচিং সেন্টার চালাতাম। শুনলাম সেখানে বাগানের লোকেরা বাঁশ দিয়ে গেইট বানিয়েছেন। মুসলমানরা যেনো রোগ ছড়াতে  বাগানে না ঢুকে । আমি ফোন করলাম চেনাশোনাদের তারা খুব খুশি খবর নিচ্ছি বলে। বললাম বন্ধুরা আসতে চাইছে। তাতেও তারা ভীষণ আগ্রহী। বললাম গেটের কথা। তারা উল্টো রাগ করলেন। আপনাদেরকে ঢুকতে  দেওয়া হবে না কেনো,আপনারা ত আমাদের নিজেদের মানুষ ইত্যাদি। যথারীতি তাদেরকে সাহায্য পাঠানো হলো।  তারমানে ওয়াটস্যাপ প্রচারের বশবর্তী হয়ে গেইট-ফেইট লাগালেও তারা নিজেদের  আশেপাশের মুসলমানদের ঘৃণা করছেন না কিন্তু। তারা ঘৃণা করছে সেইসব দৈত্য-দানবদের মিডিয়া এবং ব্রাম্মণ্যবাদীরা যাদের নির্মাণ করে দিচ্ছে। তাদের কথা ভেবে তার আতঙ্কিত হচ্ছেন। তাদের শয়তানির কথা শুনে প্রতিশোধস্পৃহা জেগে উঠছে তাদের মধ্যে। গেট লাগানোর কথা শুনে দু -একজন রাগ করে সাহায্য করতে মানা করছিলেন। কিন্তু আমরা তাদের কথা শুনিনি। কারণ একটাই। আমদের বিশ্বাস ঘৃণার বদলে ঘৃণা কখনোই সমাধান নয়। এই পরীক্ষা শেষে একদিন পৃথিবীর অসুখ সেরে গেলে মানুষ আবার মানুষ হয়ে উঠবে৷ কারণ “মানুষের মৃত্যু হ’লে তবুও মানব থেকে যায়”

লেখিকাঃ তানিয়া সুলতানা লস্কর(আইনজীবী) শিলচর 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here