আমাদের অধিকার ও মাওলানা ভাসানী- ফারাক্কা লংমার্চ দিবস

  সভ্যতার বিকাশে জলের গুরুত্ব নিঃসন্দেহে অপরিসীম একটি প্রধান উপাদান। জলের অপর নাম জীবন। প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে অনাদিকাল থেকে মানব সভ্যতার গোড়া পত্তন হয়। ইতিহাসের আদিকাল থেকে মানব সভ্যতার বিকাশ সাধিত হয়েছে জলপ্রবাহের সাহায্যে।

দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগর আর উত্তরে হিমালয়। এ দু’য়ের মহিমায় জলবায়ু প্রবাহের মধ্যে সৃষ্ট বৃষ্টি আর জলের প্রাকৃতিক প্রবাহ বঙ্গীয় বদ্বীপ অঞ্চলের কৃষিভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা ও সভ্যতায় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
এই বৃহৎ অঞ্চলর জনবসতির জীবন ধারা, কৃষি-মৎস্য-যোগাযোগ ও নগর-বন্দর সভ্যতার বিকাশ সাধিত হয়েছে নদীকেন্দ্রিক জলের প্রবাহের মধ্যদিয়ে।

১৯৪৭ সালের ১৪ ও ১৫ আগস্ট বৃটিশ শাসিত ভারতবর্ষ বিভক্ত হয়ে পৃথিবীর মানচিত্রে পাকিস্তান ও ভারত রাষ্ট্রের জন্ম হয়। ভারতবর্ষের জলের উৎস বা উৎপত্তি হিমালয়ের পাদদেশে জলরাশির বিশাল প্রবাহ চীন, নেপাল, ভারত হয়ে বাংলাদেশের বুক চিরে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। এই অঞ্চলের মিঠা জলের প্রধান উৎস হচ্ছে গঙ্গা-পদ্মা প্রবাহ। এই গঙ্গা-পদ্মার জলপ্রবাহের উপর নির্ভর করেই নেপাল, ভারত ও বাংলাদেশের অর্থনীতি, কৃষিনীতি, মৎস্য উৎপাদন এবং নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা সর্বোপরি প্রাকৃতিক ভারসাম্যও গড়ে উঠেছে। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির মধ্যদিয়ে নদীপ্রবাহও বিভক্ত হয়ে পড়ে। ১৯৬২ সালে চীন-ভারত যুদ্ধের পটভূমিতে অরুণাচল অঞ্চল ভারতের মূল ভূখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে কৌশলগতভাবে আসাম-ত্রিপুরার নিরাপত্তা হুমকির মুখে পতিত হয়। এ অবস্থায় ভারতের ভৌগোলিক নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টারা উপলব্ধি করেন গঙ্গার ওপর দিয়ে দ্রুত যুদ্ধসরঞ্জাম পূর্বাঞ্চলের নিয়ে যাওয়ার স্বার্থে জলপ্রবাহের নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই পরিকল্পনার আলোকেই ১৯৬৪ সালে বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতায় ফারাক্কা ব্যারেজ নির্মিত হয়। এটা মূলত জলের নিয়ন্ত্রণ ও যুদ্ধকালীন সময়ে জলপথে সংযোগ ব্যবস্থা চালু রাখতে গড়ে তোলা হয় ফারাক্কা বাঁধপ্রকল্প।

ফারাক্কা বাঁধ

পাকিস্তান ভারতের এই জল নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির বিরুদ্ধে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিবাদ জানিয়েছিল। ১৯৭২ সালে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন সমাপ্ত হয়। এরই মধ্যে রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্যদিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। ১৯৭৪ সালে ভারত পরীক্ষামূলকভাবে ফারাক্কা বাঁধ চালু করার কথা বলে বাংলাদেশের সমর্থন নিলেও অদ্যাবধি তা অব্যাহত আছে।

ফারাক্কা বাঁধ গঙ্গা নদীর উপর অবস্থিত একটি বাঁধ। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মালদহ ও মুর্শিদাবাদ জেলায় এর অবস্থান। ১৯৬১ সালে এই বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। শেষ হয় ১৯৭৫ সালে। সেই বছর ২১ এপ্রিল থেকে বাঁধ চালু হয়। ফারাক্কা বাঁধ ২ হজার ২৪০ মিটার (৭ হাজার ৩৫০ ফুট) লম্বা। যেটা প্রায় এক বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে সোভিয়েত রাশিয়ার সহায়তায় বানানো হয়েছিল। বাঁধ থেকে ভাগীরথী-হুগলি নদী পর্যন্ত ফিডার খালটির দৈর্ঘ্য ২৫ মাইল (৪০ কিলোমিটার)। ফারাক্কা বাঁধ ভারত তৈরি করে কলকাতা বন্দরকে পলি জমা থেকে রক্ষা করার জন্য।

তৎকালীন বিভিন্ন সমীক্ষায় বিশেষজ্ঞরা অভিমত প্রকাশ করেন যে গঙ্গা/পদ্মার মত বিশাল নদীর গতি বাঁধ দিয়ে বিঘ্নিত করলে নদীর উজান এবং ভাটি উভয় অঞ্চলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য মারাত্মকভাবে নষ্ট হতে পারে। এ ধরণের নেতিবাচক অভিমত সত্ত্বেও ভারত সরকার ফারাক্কায় গঙ্গার উপর বাঁধ নির্মাণ ও হুগলী-ভাগরথীতে সংযোগ দেয়ার জন্য ফিডার খাল খননের কাজ শুরু করে। পরবর্তীতে যা মূলত বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার রাজ্যে ব্যাপক পরিবেশ বিপর্যয় ডেকে আনে। ফারাক্কা বাঁধের কারনে রাজশাহী ক্রমশই মরুভূমিতে পরিনত হচ্ছে। ভূ-উপরিস্থ জল ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন সময় দাবি তোলা হচ্ছে। যাতে করে সরকার সেই ধরনের পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু তাও নেওয়া হয় না। ফলে শুষ্ক মৌসুম শুরু হলেই রাজশাহী অঞ্চলে জল সংকট দেখা দেয়।

পদ্মার বালুচর

ফারাক্কার বাঁধের কারণে এ অঞ্চলের পরিবেশে বিরূপ প্রভাব পড়ার পাশাপাশি তুলনামুলকভাবে বৃষ্টিপাত কমেছে। যার কারনে পুকুর, খালবিল শুকিয়ে গেছে। সেচ কাজে ভূগর্ভস্থের জলের ব্যবহার বেড়ে যাবার কারনে জলের স্তরও ক্রমশই নেমে যাচ্ছে। আর ভারত ফারাক্কার বাঁধের মাধ্যমে একতরফাভাবে জল প্রত্যাহার করে নেওয়ায় রাজশাহী অঞ্চলে খালবিল, নদীনালা, পুকুর, দিঘি এখন জলশূণ্য হয়ে পড়ে।

ফারাক্কা বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে জড়িতরা জানান, শুধু ফারাক্কা নয়, উজানে গঙ্গার বহু পয়েন্টে বাঁধ দিয়ে হাজার হাজার কিউসেক জল প্রত্যাহার করা হয়। পরিণতিতে ফারাক্কা পয়েন্টে জলের প্রবাহ দিন দিন হ্রাস পায়।

ভারত তার বহুসংখ্যক সেচ ও পানিবিদ্যুত প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মূল গঙ্গা এবং এর উপনদীগুলোর ৯০ ভাগ জল সরিয়ে নেয়। ফলে নদীতে জল প্রবাহিত হতে পারছে মাত্র ১০ ভাগ। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক এই নদীতে বাঁধের পর বাঁধ দিয়ে প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করার ফলে মূল গঙ্গা তার উৎস হারিয়ে যেতে বসেছে। অর্ধশতাব্দীর মধ্যে গঙ্গা নদীর প্রবাহ ২০ ভাগ হ্রাস পেয়েছে। সব মিলিয়ে ভারতের নানা উচ্চাভিলাষি কর্মপরিকল্পনার শিকার হয়ে ভাটির দেশ বাংলাদেশ এক ভয়াবহ প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে চলেছে।

ফলে বাংলাদেশের হাজারো চিৎকার আর আহাজারি সত্ত্বেও ফারাক্কা পয়েন্টে জল না থাকার ফলে বাংলাদেশ তার ন্যায্য হিস্যা তো দূরে থাক সাধারণ চাহিদাটুকুও পূরণ করতে পারে না।
‘এই বঞ্চনা ও দেশের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে জনদুর্দশার আশঙ্কায় প্রাজ্ঞ ও দূরদর্শী মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানী জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ফারাক্কা অভিমুখে ঐতিহাসিক মিছিল করে ভারত সরকারের নিকট প্রতিবাদ করেন এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ের নিকট বিষয়টি তুলে ধরেন। তখন থেকে ব্যাপক মানববিপর্যয় সৃষ্টিকারী ফারাক্কা বাঁধের বিষয়টি আন্তর্জাতিক মঞ্চে আলোচিত হতে থাকে।

ফারাক্কা লংমার্চে বক্তৃতা দিচ্ছেন মওলানা ভাসানী
(ছবিসুত্র-ইন্টারনেট)

১৯৭৬ সালের এই আজকের দিনে লংমার্চ শুরুর আগে সকাল সোয়া ১০টার দিকে রাজশাহী মাদ্রাসা ময়দানের মঞ্চে বক্তব্য রাখেন মাওলানা ভাসানি। জনসমুদ্রের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমরা আপোষে ফারাক্কা সমস্যার সমাধানে আগ্রহী।

“ভারত যদি আমাদের শান্তিপূর্ণ প্রস্তাবে সাড়া না দেয় বিশ্বের শান্তিকামী জনগনও ভারতের বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু করবে।” ৫ মে সকালে রাজশাহী মাদ্রাসা ময়দানে লক্ষ লক্ষ জনতার সমাবেশে প্রায় ১০ টায় মাওলানা ভাসানী পৌঁছলে “সিকিম নয় ভারত নয় এদেশ আমার বাংলাদেশ”, “ভেঙ্গে দাও গুড়িয়ে দাও ফারাক্কা বাঁধ, ফারাক্কা বাঁধ”, “লও লও লও সালাম মাওলানা ভাসানী” ইত্যাদি গগনবিদারী শ্লোগানে শ্লোগানে প্রকম্পিত করে মাওলানা ভাসানীকে সালাম এবং ভারতের আগ্রাসী নীতির প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।
বাংলাদেশের জন্য এই বাঁধ মারাত্মক ক্ষতি ডেকে আনবে এটা বুঝে দুরদর্শী, অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে চির বিদ্রোহী মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী প্রতিবাদের ঝড় তুললেন। তিনি ভারতের এহেন শত্রুতামূলক কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিশ্বনেতাদেরকে তার বার্তা পাঠিয়ে মরণ বাঁধ ফারাক্কা সর্ম্পকে জানালেন এবং ইন্দিরা গান্ধীকে প্রভাবিত করার আহবান জানালেন। একই সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধীর কাছেও ফারাক্কার ভয়াবহতা জানিয়ে গঙ্গার জল অন্যদিকে প্রবাহিত না করার জন্য আহবান জানিয়েছিলেন। অন্যদিকে সমস্ত জাতিকে উজ্জ্বীবিত করে ঐক্যবদ্ধ করে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষন এবং ভারত সরকারকে বাংলাদেশের দাবী মানতে বাধ্য করার জন্য ১৯৭৬ সালের ১৬ মে ফারাক্কা মিছিল করেছিলেন যা দেশের জনগণকে এবং বিশ্ব বিবেককে প্রচন্ড নাড়া দিয়েছিল।

নির্মিত সেতুর উপর দিয়ে মহানন্দা পেরিয়ে যাচ্ছে ফারাক্কা মহামিছিল। (১৬ মে, ১৯৭৬)

মাওলানা ভাসানী বাঁধ দিয়ে বাংলাদেশকে মরুভুমিতে পরিনত করার ভারতীয় ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে হুশিয়ারী উচ্চারণ করেছিলেন। তিনি ইন্দিরা গান্ধীকে বাংলাদেশে এসে এবং বাস্তব পরিস্থিতিতে দেখে যেতে বলেছিলেন। তিনি বিশ্ব নেতাদেরকে ভারতের উপর প্রভাব কাটানোর আহবান জানিয়েছিলেন। তিনি দেশী বিদেশী সকল ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহবান জানিয়েছিলেন।

পরবর্তীতে ১৯৭৬ সালের ২৬ নভেম্বর সাধারণ পরিষদে আলোচনার প্রেক্ষিতে ১৯৭৭ সালের ৫ নভেম্বর একটি চুক্তি হয়েছিল। পরে আরো আলোচনা এবং আরো অনেক চুক্তি হয়েছে। সর্বশেষ গ্যারান্টি ক্লজ বাদ দিয়ে করা চুক্তিটি দেশের চরম ক্ষতি করেছে। সার কথা হচ্ছে, ন্যায্য হিস্যা বা সমবণ্টন বাংলাদেশ কোন সময় পায়নি। তাছাড়াও আরো অনেক আন্তর্জাতিক নদীতে বাঁধ দিয়ে বাংলাদেশকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে বিভিন্নভাবে অপূরনীয় ক্ষতি করে চলেছে। তিস্তা চুক্তি নিয়েও গড়িমসি করছে। মাওলানা ভাসানী ও বিশেষজ্ঞ মহলের ধারনা সত্য প্রমাণিত হয়েছে।

সমগ্র উত্তরাঞ্চলে মরুকরণ, নদীর লবণাক্ততা বৃদ্ধি, ভূ অভ্যন্তরে জলের স্তর নীচে নেমে যাওয়া, বর্ষাকালে বন্যার কারণে পরিবেশ, কৃষি, মৎস্য, শিল্প ও নৌ পরিবহন ইত্যাদি ক্ষেত্রে সীমাহীন অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া আরো অনেক সমস্যা অমিমাংসীত রয়েছে। স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতের অবদানের জন্য জনগণ শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানালেও তাদের আধিপত্যবাদী দাদা সুলভ আচরণ জনগণকে হতাশ করেছে। জনগণ তাদের কাছে বন্ধুসূলভ আচরনই প্রত্যাশা করে।

মওলানা ভাসানীর জীবদ্দশায় পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদী শাসকগণ মাওলানা ভাসানীকে ‘প্রফেট অব ভায়োলেন্স’, ‘ফায়ার ইটার’ অভিধায় চিহ্নিত করেছিলেন তার আজীবন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী রাজনৈতিক চিন্তা, আন্দোলন-সংগ্রাম ও ভূমিকার কারণে। ভাসানী রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই ভারতবর্ষে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন, অত্যাচার, নির্যাতন ও বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদী সামরিক জোটের বিরুদ্ধে জোরদার আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে তুলতে ভূমিকা নেন।

সমাজ-জীবনকে কলুষিত, অনটন-জর্জরিত এবং দুর্নীতির পঙ্কে ডুবিয়ে রাখা সাম্রাজ্যবাদীদের একটি কৌশল। কৃষক ও শ্রমিক শ্রেণীকে যদি কেবল অসহায় দুর্ভিক্ষের মোকাবিলা করার কাজে ব্যাপৃত রাখা যায় তবে তারা আর রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে চিন্তা করার সময় পাবে না। রাষ্ট্রব্যবস্থা ও শাসনযন্ত্র সম্পর্কে কৃষক শ্রমিকদের উদাসীন রাখা গেলে সাম্রাজ্যবাদী শোষণ অব্যাহত রাখা সহজ ও সম্ভব হয়।

সাম্রাজ্যবিরোধী র‍্যাডিক‍্যাল আন্দোলন তখনকার সময়ে এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার নিপীড়িত জাতি জণগোষ্ঠীর মধ্যে আশার সঞ্চার করে।  বিশেষ করে হাভানা ত্রিমহাদেশীয় মহাসম্মেলনে ভাসানীর যোগদান ও বক্তৃতার রাজনৈতিক তাৎপর্য অনেক।

।তিনি ঐ সম্মেলনে সাম্রাজ্যবাদের নতুন নতুন আগ্রাসনকে সামনে এনে বলেছিলেন, ‘এখন আমাদের কর্তব্য হচ্ছে, নতুন ও পুরনো উপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে বিভিন্ন দেশের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনসমূহকে সক্রিয় ও সম্মিলিত সমর্থন দান করা।’ ওই সময়ে বিশেষ করে ভিয়েতনাম, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার উপর যুদ্ধ ও সামগ্রিকভাবে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন রোধে ভাসানীর এই উচ্চারণ নিপীড়িত মানুষকে আশাবাদী করে তোলে।
মাওলানা ভাসানীর ফারাক্কা মিছিল ভারত সরকারকে ফারাক্কা চুক্তি করতে প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করেছিল, জনগণকে দেশপ্রেমে উজ্জ্বৃীবিত করেছিল, যে কোন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে অনুপ্রানিত করেছিল। আগ্রাসী শক্তি ও বিদেশী ষড়যন্ত্র ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবেলার শিক্ষা দিয়ে ছিল। আজকে মাওলানা ভাসানী বেঁচে থাকলে দেশী বিদেশী ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ‘খামোশ’ বলে হুংকার ছাড়তেন।

আজকে তিনি নেই কিন্তু জনগণ শুধু ফারাক্কা লং মার্চ নয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষের অধিকার আদায় ও সর্বোপরি প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসার সংগ্রামে মাওলানা ভাসানীর অবদান চিরদিন মনে রাখবে এবং প্রতিটি সংকটে তার দেখানো পথ অনুসরণ করবে।

ভারতে নামী সংরক্ষণ অ্যাক্টিভিস্ট ও নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনের নেত্রী মেধা পটেকর বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, “একটা বাঁধের প্রভাব যদি খুব ধ্বংসাত্মক হয়, ফারাক্কাতে যেটা হয়েছে, তাহলে সেটা ডিকমিশন করার অসংখ্য নজির কিন্তু দুনিয়াতে আছে।”
মেধা পাটকরের মতো অ্যাক্টিভিস্ট ও অনেক বিশেষজ্ঞও বিবিসিকে বলছেন, ভারতেও ফারাক্কা এখন সুবিধার চেয়ে অসুবিধাই বেশি ঘটাচ্ছে – কাজেই এটি অবিলম্বে ‘ডিকমিশন’ করা দরকার।

ফারাক্কা থেকে মাত্র বিশ কিলোমিটার দূরে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে যেমন এই ব্যারাজের মারাত্মক বিরূপ প্রভাব পড়েছে – তেমনি ভারতেও কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে ফারাক্কা নানা ধরনের বিপদ ডেকে এনেছে।

বিহারের গাঙ্গেয় অববাহিকায় প্রতি বছরের ভয়াবহ বন্যার জন্য ফারাক্কাকেই দায়ী করে মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার তো এই বাঁধটাই তুলে দিতে বলেছিলেন।

কিন্তু পরিতাপের বিষয় পুঁজিপতি ও মুনাফা বাদীদের মুনাফা অর্জনের জন্য সৃষ্ট বিভিন্ন বড়ো বড়ো বাঁধ ও ড্যাম যা মানব সমাজ তথা প্রকৃতির ডাইভারসিটি নষ্ট ও নদীর গতি রোধ করে স্বাভাবিক প্রবাহ কে বাধা দান করছে, সেই প্রভূত ক্ষতির হাত থেকে বাঁচানোর জন্য আজ ভারত ও বাংলাদেশে নানা একটিভিটি ও আন্দোলন গড়ে উঠছে অথচ আজ থেকে অনেকদিন আগে এর কুফল প্রতিরোধের দূরদর্শিতায় প্রথম যে সঙ্ঘবদ্ধ ভাবে গণ আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন সেই মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানি আজ জানিনা কোন অজানা কারণে প্রকৃতি প্রেমীদের কাছে ব্রাত্য! অনেকেই হয়ত তাঁর নামটুকু ও শোনেনি বা জানলেও শুধু মাত্র তাঁকে একজন মৌলবি, রাজনীতিবিদ বা ইসলামিক সমাজতন্ত্রের নায়ক হিসাবে কাটাছেড়া করেন।

অথচ তাকে স্মরণ করার মানেই হলো, সাম্রাজ্যবাদী শোষণ, যুদ্ধ ও অনৈতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ব্যক্তি, দল, গ্রুপ, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সম্মিলিতভাবে অবস্থান নেওয়ার প্রয়োজনীয় সংগ্রাম ও ভূমিকার কথা।

লেখক- আলমাস আল ইসলাম

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here