অনলাইনে পড়াশোনা! মনীষা বন্দ্যোপাধ্যায়

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের “অনুবর্ত্তন” উপন্যাসে জাপানি বোমার ভয়ে খালি হতে থাকা শহরের নামজাদা ক্লার্কওয়েল সাহেবের ইস্কুলে শূন্য ক্লাসরুমে প্রমোশনের লিস্ট পড়ার চমকপ্রদ বর্ণনা আছে ।

মনীষা বন্দ্যোপাধ্যায়

সেখানে “ফাঁকা হাওয়া এ-জানালায়  ও-জানালায় হা-হা করিতেছে কড়িকাঠে টিকটিকি টিকটিক করিয়া উঠিল।” এই মুহূর্তে করোনা আক্রান্ত পশ্চিমবঙ্গে তথা প্রায় গোটা দুনিয়ায় লকডাউন এর জেরে ক্লাস রুমের অবস্থা এরকমই। ছাত্র-শিক্ষক সবাই ঘরবন্দি । পড়াশোনা শিকেয়।  পরিস্থিতি এমনই যে কবে আবার স্বাভাবিক ক্লাস হবে তা অনিশ্চিত ।অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা সম্পূর্ণ শেষ হয়নি ,থেমে আছে ।যে সমস্ত স্কুলে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা কেন্দ্র সেখানে প্রথম পর্বের পড়াশোনা এই সময়টাতেই হয়। সেখানে এবছর বইয়ের সাথে ভালো করে সম্পর্কই গড়ে ওঠেনি ,সিলেবাস শেষ তো দূরের কথা ।লক্ষ লক্ষ ছাত্র ছাত্রীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত । ইউনেস্কোর তরফে জানা যাচ্ছে গোটা দুনিয়ায় ছাত্র-ছাত্রীদের ৮৯% করোনা ত্রাসে এখন স্কুলের বাইরে ।আর এই ছাত্র-ছাত্রীদের বিরাট এক অংশ বাস করে অনুন্নত দেশে।

এই অবস্থায় অপেক্ষাকৃত উন্নত দেশ যারা এই মুহূর্তে করোনার আক্রমণে ধরাশায়ী সেখানে প্রযুক্তির সাহায্যে অনলাইনে ক্লাস চলছে।

বিভিন্ন ধরনের সফটওয়্যার যা একই সঙ্গে একই সময়ে বহুজনকে জুড়ে রাখতেপারে তার চাহিদা তুঙ্গে। এর মাধ্যমে শিক্ষক পড়াচ্ছেন ,ছাত্রছাত্রীরা তাদের প্রশ্ন রাখছেন। অনলাইনেই বাড়ির কাজ নিয়ে শিক্ষকের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া যাচ্ছে ।এই গোটা শিক্ষাপদ্ধতি কোন ভাবেই স্পর্শদোষে দূষিত নয় ।

এ দেশেও এরকম উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে মূলত বেসরকারি স্কুলগুলিতে ।কোথাও কোথাও এ ব্যবস্থা আগে থেকেই ছিল ,বাকি অনেক জায়গাতেই নতুন করে ই-লার্নিং এর  ব্যবস্থা করে নেওয়া হয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন উঠছে সেই বৃহত্তর শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে যা সরকারি এবং এদেশের অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী তারই আওতার মধ্যে আছে। শিক্ষার অধিকার আইন বলবৎ হওয়ার পর এদেশে বিভিন্ন প্রচেষ্টায় এক বিপুল সংখ্যক ছেলেমেয়েদের শিক্ষার আঙিনায় আনা গেছে। কন্যাশ্রীর মত প্রকল্প মেয়েদের উচ্চশিক্ষা অনেকটা নিশ্চিত করেছে। কিন্তু এই যে দীর্ঘ  বিরাম তাতে  আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে যে স্কুল চালু হতে হতে অনেক ছেলেমেয়ে আবার হয়ত হারিয়ে যাবে । বিদ্যালয়ে দৃশ্যমান মেয়েরা চোখের আড়ালে গেলে বাল্যবিবাহ থেকে নারী পাচার যেকোনো কিছুই ঘটতে পারে ।অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে যে সরকারি স্কুলের অবৈতনিক ছাত্রীনিবাসে দরিদ্র শ্রমজীবী পরিবারের মেয়েরা অনেকেই ছুটির সময়েও বাড়িতে যেতে চায়না । এই মুহূর্তে লক ডাউন এর সময় নানান আর্থিক সংকটে জর্জরিত পরিবারে এই মেয়েরা বহু ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত চাপের সামনে পড়বে। প্রতীচী ট্রাস্ট এর সাবির আহমেদ এর অনুমান পরবর্তী পর্যায়ে সামগ্রিকভাবে আর্থিক অবস্থা এতটাই কঠিন হবে যে ছেলেদের একটা বড় অংশকে লেখাপড়া ছেড়ে কাজে নামতে হবে।

শিক্ষক সমাজও মনে করছেন এত দীর্ঘ দিন ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে বিচ্ছিন্ন থাকা ঠিক নয়। শিক্ষকদের এক কালে সবার সেরা সমাজ বন্ধু বলে চিহ্নিত করা হতো। “অনুবর্ত্তন” উপন্যাসের সময় কালে যদুবাবু  ক্ষেত্রবাবুরা অত্যন্ত কম বেতনে টেনেটুনে সংসার চালাতেন। আজকে মজবুত বেতন কাঠামো নিয়ে সরকারী শিক্ষকরা যথেষ্ট প্রতিষ্ঠিত। তাদের প্রতি সামাজিক মনোভাবের ও পরিবর্তন হয়েছে। এই দুর্দিনে তারা শুধু বসে বসে মাইনে নিচ্ছেন এমন অভিযোগ উঠছে ।কিন্তু সত্যটা এই যে শিক্ষকদের বড় অংশই ক্লাসঘরে ফিরে যেতে চাইছেন। ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে জুড়ে থাকতে চাইছেন।  এই যে শিক্ষাদিবস গুলি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে তার পূরণ কিভাবে হতে পারে তা নিয়ে বহু ভাবনা চলছে।

সরকারের তরফেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।  টিভিতে নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণী বিভিন্ন বিষয়ে পাঠদান চলছে ।প্রতিদিন ছাত্র-ছাত্রীরা সেখানে সরাসরি কথা বলতে পারছেন ।বাংলার শিক্ষা পোর্টালে প্রাথমিক ও উচ্চ প্রাথমিকের সব বিষয়ের বেশ কিছু কাজ দেওয়া আছে।  বহু স্কুলেই অনলাইনে পড়ানোর চেষ্টা চলছে। শহরের অপেক্ষাকৃত সচ্ছল পরিবারের ছাত্র-ছাত্রী যে স্কুলে যায় সেখানে অনলাইনে গ্রুপ তৈরি করে পড়াশোনা চলছে। কোথাও বা ইউটিউব চ্যানেলে শিক্ষক-শিক্ষিকারা ক্লাস নিচ্ছেন। বীরভূমের চিনপাই উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিদ্যুৎ মজুমদার প্রস্তাব রেখেছেন যেভাবে ঐক্যশ্রী, সবুজসাথী প্রকল্পের জন্য এস এম এসে ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে যোগাযোগ রাখা হয়, সেই ভাবেই ক্লাসভিত্তিক ছোট ছোট কাজ এস এম এসে দেওয়া যেতে পারে।

মুশকিল সেখানেই যে এই প্রযুক্তি বেশিরভাগ ছাত্র ছাত্রীর আয়ত্তের বাইরে। এন এস এস ও তথ্য বলছে গ্রামাঞ্চলে মাত্র ৮.৮ শতাংশ  মানুষ এই প্রযুক্তি ব্যবহারে সক্ষম ।শান্তিনিকেতনের কাছাকাছি খঞ্জনপুর এলাকায় আদিবাসী ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষার সাথে যুক্ত সুশান্ত ঘোষ জানালেন তার এলাকার আদিবাসী পরিবারের মানুষ এখন কর্মহীন । টিভি থাকলেও কেবল এর পয়সা দিতে পারছেন না, ফোনে নেট তো দূরের কথা। এটা তো সত্য যে ফ্রি ওয়াইফাই এর সুযোগ বিমানবন্দর,রেলস্টেশন বা শহরের কিছু কিছু জায়গায় মেলে, প্রত্যন্ত গ্রাম ডিজিটাল ইন্ডিয়ার স্বপ্নেও আসে না। ধরেই নেওয়া হয়েছে যে পার্কস্ট্রীটে যারা ঘুরে বেড়ান তাদের জন্যেই বিনামূল্যে নেট যোগাযোগ দরকার।

এই লকডাউন পর্বে গ্রাম থেকে অভিভাবকদের তরফে যে খোঁজ আসছে সেটি হল আবার কবে মিড ডে মিলের আলু চাল দেওয়া হবে। পেটের ভাতের যেখানে সংকট সেখানে রিচার্জের বিলাস চলে না।

শুধুমাত্র মোবাইল থাকার জন্য কিছু ছাত্র ছাত্রী এই অনলাইন প্রক্রিয়ায় অংশ নেবে আর একটি বিশাল অংশ  যারা আর্থসামাজিক ভাবে কোণঠাসা তারা আবারো বাদ পড়ে যাবে, এতে সর্ব শিক্ষার মৌলিক উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে। এই বিচ্ছিন্নতার প্রক্রিয়া আরো বেশি অমঙ্গল ডেকে আনতে পারে।

বরং এই ভাবনা শুরু হওয়া দরকার যে কীভাবে দুর্দিনে দূরশিক্ষা দেওয়া সম্ভব। অন্যদিকে এই যোগাযোগ রাখতে পারলেই স্কুল ছুট কমানো যাবে, ঘরে কী ঘটছে সেটাও খানিকটা বোঝা যাবে। শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, নারী পাচার এবং শিশুনিগ্রহের ঘটনার মোকাবিলা করা যাবে।

আজ যখন ছাত্র-ছাত্রীদের বই খাতা ব্যাগ জুতোর পাশাপাশি সাইকেল দেওয়া যায়, তাহলে প্রযুক্তিতে অসামান্য বিপ্লব নিয়ে আসা তেমন কোন সংস্থা কি এগিয়ে আসবেনা অপেক্ষাকৃত সুলভ মূল্যে ছাত্র-ছাত্রীদের এমন একটি সরল ট্যাব বা ফোন দিতে  যা  নিখরচায় তাদের শিক্ষকদের সাথে যুক্ত রাখতে পারে?

খাদ্য বস্ত্র বাসস্থান ও স্বাস্হ্যের মত শিক্ষাও সেই মৌলিক অধিকার যা থেকে কোনো অবস্থাতেই মানুষকে বঞ্চিত করা যায় না।

লেখিকা- লাভপুর সত্যনারায়ণ শিক্ষা নিকেতনের প্রধান শিক্ষিকা মনীষা বন্দ্যোপাধ্যায়

1 COMMENT

  1. বাস্তব সম্যসা তুলে ধরার জন্য আপনাকে ধন্যবা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here