ইফতার-এ-ভালোবাসা

পবিত্র রমজান মাসে যূথবদ্ধ সামাজ জীবনের এক উজ্জ্বল চিত্ররূপ ইফতার। ভাইরাসের আক্রমণ কেড়ে নিয়েছে সেই মিলনমেলা। বিগত এক ইফতারের স্মৃতি আজও চির ভাস্বর

 

রাজীব চক্রবর্তী

ট্রেন থেকে যখন নামলাম তখনও সন্ধ্যে হয় নি। বিকেলের পড়ন্ত রোদে গুমোট আবহাওয়ায় ঘামে ভিজে পৌঁছলাম গন্তব্যে। কোথায়? উপমহাদেশের কোনও এক শহরে। সেটা হতে পারে ইসলামাবাদের গলি , হতে পারে ঢাকার রমনা ময়দান , কিংবা কোলকাতার কোনও এক অঞ্চল যা নাকি প্রতিবেশি দেশের ক্ষুদ্র সংস্করণ নামে কুখ্যাত। নামে কি এসে যায়!

কথা ছিল ছ’টার মধ্যে পৌঁছতে হবে। ছটা পাঁচের আগেই পৌঁছে গেলাম অতিথিবত্‍সল মানুষটির বাড়ির দরজায়। এলাকার প্রিয় এই দাদা বা ভাইজানের নাম জানাতে পারব না। যে মানুষটা শীতের হাত থেকে বাঁচার জন্য দরিদ্র্য শবর পরিবারের হাতে কম্বল তুলে দেন অথচ তাঁর বেগম সাহেবা জানতে পারেন না , সেই মানুষটা ইফতারে কিছু মানুষকে আমন্ত্রণ জানিয়ে নিজের নাম প্রকাশ করতে চাইবেন না সেটাই স্বাভাবিক। প্রথমেই বলে দিলেন , এটাকে ইফতার পার্টি ভাবার কারণ নেই। ইফতার উপলক্ষ্যে একসাথে বসে খাব আর আড্ডা দেব।

সম্ভ্রম জাগানো ব্যক্তিত্বসম্পন্ন , সুদর্শন মানুষটা আমাদের হাসিমুখে নিয়ে গেলেন ভিতরে। দরজা দিয়েই ঢুকেই হলঘর। মেঝেতে ছোট ছোট কার্পেট পাতা। এটা আসলে একটা বাচ্চাদের স্কুল। আর পাশেই দাদার বসত। ধীরে ধীরে জেনেছি কত কষ্ট করে এই স্কুল গড়েছেন তিনি। লক্ষ্য এলাকার বাচ্চাদের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করা। সব সফল পুরুষের মত এক্ষেত্রেও আড়ালে একজন নারী। দাদার ঘরণী অর্থাত্‍ ভাবীর সাহায্যেই সব বাধা পেরিয়ে গড়ে উঠেছে এই স্কুল।

ঘড়িতে সোয়া ছটা বাজল। কাছের মসজিদ থেকে ভেসে এল আজানের সুর। গোল হয়ে বসা সবার সামনে চলে এল সরবতের গ্লাস। পিপাসায় কাতর শরীর চাইল এক চুমুকে গ্লাস শেষ করতে। পারলাম না। যে মানুষগুলো সারাদিন রোজা রাখার পরও অতিথিদের সামনে থালা, গ্লাস সাজিয়ে দিচ্ছেন তাদের রোজা ভাঙা অবধি অপেক্ষা না করাটা অন্যায়।

প্রথমেই এল এক থালা ফল। আম , শশা , তরমুজ , কলা প্রভৃতি নানা ফলের সাথে শুকনো খেজুর , তার সাথে পিঁয়াজ , টমেটো , লঙ্কা ইত্যাদি দিয়ে মাখা ভেজানো ছোলা আর ডাল। লাল , সবুজ , হলুদ, খয়েরি নানা রঙের আলপনা থালা জুড়ে। খাওয়ার সাথে শুরু হল আড্ডা। একদল প্রাণচঞ্চল যুবক আর তাদের মধ্যমণি এক মাঝবয়সী দিলদরিয়া মানুষের সান্নিধ্যে জমে উঠল ইফতারি আড্ডা।

আপাত গম্ভীর মানুষটি কথা বলতে শুরু করলে বোঝা যায় আড্ডা আর খাওয়া, বাঙালীর এই চিরন্তন বিনোদনের পরম্পরা সার্থকভাবে বয়ে নিয়ে চলেছেন মানুষটি। সঙ্গী খাদ্যরসিক , দিলখোলা যুবকের উদ্দেশ্যে দাদার রসিকতা – কি হে, তুমি তো রোজা রাখো না। অথচ ইফতারে হাজির! উদার মনের যুবকের সহাস্য উত্তর – দাদা, আপনি তো জানেন আমি দাওয়াতে যাই না। দাওয়াত আমার সাথে যায়। এক মুঠো ছোলা মুখে পুরে আবার বলে, আমি ধার্মিক নই কেন জানেন? ভাবলাম নিশ্চয়ই কোনও ভারী দর্শনের উত্তর হবে। কিন্তু এ ছোকরা যে স্বভাব আমুদে। হাসতে হাসতে বলে, আমার বিশ্বাস পৃথিবীর ধার্মিক মানুষের সংখ্যা সর্বদা ধ্রুবক। তাই চিন্তার কারণ নেই। আমি মসজিদে না গেলে আরেকজন সূযোগ পাবে। এভাবেই আড্ডার বৈশিষ্ট্য মেনে ভালবাসার টানে এক সময় ঘুঁচে গেল বয়সের ব্যবধান। তবে বজায় রইল পারস্পরিক সম্মান প্রদর্শন।

থালায় সাজানো ফলের আলপনা মুছে দিয়ে নিশ্চিন্তে যে আড্ডা দেব তার কি উপায় আছে! ফেজ টুপি পরা যুবকরা ভিতরের ঘরের দিকে হেঁটে যাওয়া মানেই বিপদ। যতবার গেছে সাথে কিছু না কিছু নিয়ে এসেছে। ফলের পরে এল চপ। বাঙালীর আড্ডার আদি , অকৃত্রিম সাথী। লংকা, ডিম , মাংস – তিন ধরণের চপ খেয়ে ভাবলাম এবার মুক্তি। সে গুড়ে বালি। ধনেপাতা আর পুদিনার চাটনি দিয়ে এক যুবক চলে যেতে না যেতেই আরেকজন নিয়ে এল ঘরে বানানো চিকেন রেশমি কাবাব। তার পিছু পিছু এসে হাজির পেল্লায় এক মাটন প্যাটিস। এবার পেট না ফেটে যায়!

দাদা কিন্তু এত কিছু খাচ্ছেন না। সামান্য কিছু নিয়ে নির্বিকারভাবে বলে চলেছেন ছেলেরা যে যার নিজের পছন্দমত সামান্য আয়োজন করেছে।

এটা সামান্য! এত খাওয়া যায় দাদা?

এতো সবে শুরু। গল্প করতে করতে খান।

চপ – কাবাব – প্যাটিস খেয়ে আর বসে থাকা গেল না। এবার একটু না হাঁটলেই নয়। ভাবতে ভাবতেই দেখি চ্যাপ্টা মাটির বাটিতে ফিরনি এসে গেল। কোনও রকমে শেষ করে একদম রাস্তায়। আমাদের সাথে সাথে যুবকের দলও বাইরে চলে এল। বেশ কিছুক্ষণ আড্ডার পর এক যুবক বলল – দাদা , ভিতরে চলুন। ঠান্ডা হয়ে গেলে ভাল লাগবে না। মানে আবার খাওয়া! একটু ঘোরাঘুরি করে যদিও পেটের চাপ কমেছে তা বলে আর খাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু কে কার কথা শোনে? বিশ , তিরিশ , পঁয়ত্রিশের যুবকদল হইহই করে নিয়ে গেল ভেতরে। আসল জিনিসই যে এখনো বাকি। গল্প করতে করতেই নাকি খাওয়া হয়ে যাবে।

গল্পে আপত্তি নেই। কিন্তু খাবার কথা শুনলেই পালাতে ইচ্ছে করছে। আবার কবে দেখা হবে তাই ইফতারের আসল জিনিস না খাইয়ে কিছুতেই ছাড়বে না। গল্পের মধ্যেই চলে এল সিমাই আর হালিম। কিছুদিন আগেই এক হিন্দু কিশোরীকে রোজা ভেঙে রক্ত দেওয়া যুবককে নিয়ে শুরু হল হাসি – ঠাট্টা। ভালবাসা মাখা রসিকতা সে উপভোগ করল চেটেপুটে। এরই মধ্যে এক যুবক আব্দার জানাল ঈদ উপলক্ষ্যে দেওয়া তার জামার দোকান দেখতে যাওয়ার জন্য।

সংগত কারণেই খাওয়ার গতি স্লথ হয়েছে। বেড়েছে গল্পের গতি। গৃহকর্তা মেলে ধরেছেন তার জীবনের নানা কাহিনী। কখনও নিজের উদ্যোগে লিটিল ম্যাগাজিন বের করেছেন, কখনো আবার সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের পুরোধা। এলাকার ছেলেমেয়েদের নিয়ে আয়োজন করেন রবীন্দ্র – নজরুল সন্ধ্যা। কোনও ধর্মের প্রতি অন্ধ আনুগত্য নেই। পরিস্কার বলে দিলেন যুক্তিহীন অন্ধ বিশ্বাসের কথা যে শোনাতে আসবে তাকে ঘাড় ধরে বের করে দেব। উদার মনের মানুষটি শোনালেন এক হিন্দু মেয়ের সাথে মুসলমান ছেলের বিয়ের কথা। এক্ষেত্রে লাভ জেহাদের গন্ধ খোঁজার দরকার নেই। সমাজ , মৌলবী সবাইকে যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে নাছোড়বান্দা হিন্দু মেয়েটির সাথে নিজের আত্মীয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন।

কোনও মতে হালিম শেষ হল। এরপরে নাকি পরোটা আর বিরিয়ানি আছে। জামার দোকান দেখতে যেতে হবে বলে অতি কষ্টে ভালবাসার অত্যাচারে শহীদ হওয়ার হাত থেকে বাঁচা গেল। চললাম ঈদের দোকান দেখতে।

বিভিন্ন ডিজাইনের রেডিমেড শার্ট দেখতে দেখতে ভাবছিলাম একটা শার্ট তো নিতেই হবে। নানা সামাজিক কাজকর্মে যুক্ত ছেলেটা নিজের পকেটের পয়সা খরচ করে মানুষের উপকার করে। ওর দোকান থেকে জিনিস কেনা মানে অন্যের উপকারে আসা। কিন্তু সাধারণ হিসেবি বুদ্ধি কি আর ভালভাসার তল খুঁজে পায়! নিজেই একটা শার্ট পছন্দ করে দিল। অনেকবার জিজ্ঞেস করার পরেও কিছুতেই দাম বলে না। যতবারই বলি ভাই কত দেব? ‘বলছি’, ‘ সে হবেখন’ – এইসব বলে এড়িয়ে যায়। শেষে কুন্ঠা নিয়ে বলে, দাদা ঈদ উপলক্ষ্যে এটা ছোট ভাইয়ের উপহার। এই কথার পরে আর কিছু বলার থাকে না।

ঘড়ির কাঁটা ন’টা ছাড়িয়েছে। বাড়ি ফিরতে হবে। সকলের দাবি ঈদের দিনে আসতেই হবে। মজা করে বললাম, না ভাই আসতে পারব না। তিনঘন্টা ধরে প্রবলভাবে অত্যাচারিত হয়ে কোনওক্রমে প্রাণ নিয়ে ফিরছি। আবার ঈদের দিনে!

সবার থেকে বিদায় নেবার পালা। কেউ হাত ধরে, কেউ বুকে জড়িয়ে বিদায় দিল। মুক্তমনা এক প্রবীন আর তাকে ঘিরে থাকা একদল যুবক – শ্রদ্ধা ও ভালবাসার এক বলয় তৈরি করেছে। জীবনের টানে দৈনন্দিন জীবিকার অবসরে নিজেদের জড়িয়ে রেখেছে মানুষের কল্যানে। সেখানে না আছে ধর্ম , না আছে রাজনীতি। এই মানুষগুলোর কাছে ধর্ম জীবনের একমাত্র অবলম্বন নয় , অনুষঙ্গ মাত্র।

গরমের মধ্যে শরীরে প্রচুর ক্যালোরি আর প্রোটিন ঢুকে ঘুমের বারোটা বাজাল। রাত্রে এপাশ ওপাশ করছি আর ভাবছি- এই যে মানুষে মানুষে এত বিদ্বেষ , তা কি শুধু ধর্মের জন্য? কিন্তু আজকের সন্ধ্যে তো অন্য কথা বলে। মূল সমস্যাটা ধর্ম নয়। দাবার সহজ চাল। ধর্মের বোড়েকে এগিয়ে দিয়ে রাজা – মন্ত্রীদের সুরক্ষিত করার চেষ্টা। তার সাথে মিশে আছে জাতিগত বৈশিষ্ট্যকে অস্বীকার করার অশিক্ষিত ঔদ্ধত্য।

শতাব্দীর পর শতাব্দী কেটে গেছে। জমা হয়েছে মান-অভিমান, অবিশ্বাস, সন্দেহ আর ঘৃণার পাথর। শীতল বরফের প্রাচীরে ঢাকা পড়েছে মনের সবুজ আঙিনা। আঙিনার দু’দিক থেকে জ্বালানো হৃদয়ের আগুনই পারে বরফ গলিয়ে ভালবাসার নদী বানাতে। সেই ভালবাসার উষ্ণতা জীবনের আনন্দ স্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে গেল জৈষ্ঠ্যের এক আগুন ঝরা সন্ধ্যায়।

লেখক- রাজীব চক্রবর্তী

2 COMMENTS

  1. আহা ! সেক্যু আড্ডা….

    আল্লাহর বিরুদ্ধে চলো, তাহলে তুমি মহান, মুক্তমনা,
    সেক্যু দের বিরুদ্ধে গেলে, আরে! 😲😳এতো জঙ্গিপনা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here