ঈশ্বর আর কাভেরীর বিয়ে

ঈশ্বর আর কাভেরীর বিয়েতে জাত, ঘর, জমিজমা, টাকাপয়সার সমস্যা ছিল না। দুজনের মধ্যে ভালবাসাও ছিল গভীর। অসুবিধা শুধু এটুকুই ছিল যে কাভেরীর জন্মছকের সপ্তম ঘরে মৃত্যুযোগ ছিল।

যদি ঈশ্বর ও কাভেরীর বিয়ে হয়। তাই দুই বাড়িতেই এ বিয়েতে মত ছিল না। কিন্তু ভালবাসা কিছুরই তোয়াক্কা করে না। সব বাধা বিপত্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ঈশ্বর ও কাভেরী পালিয়ে বিয়ে করে। তারপর কেটে যায় অনেকগুলো বছর। ভাগ্যদোষেই হোক বা কাকতালীয়, কাভেরী ভয়ঙ্কর অসুখে পড়ে। ঈশ্বর নানা চেষ্টা করেও কাভেরীকে সারিয়ে তুলতে পারে না। নানা ডাক্তার, ওষুধপথ্য করার পর ঈশ্বর যখন হাল প্রায় ছেড়ে দিয়েছে, কেউ একজন পরামর্শ দেয় যে, যে স্বামীর রক্ষিতা থাকে, তার স্ত্রীর আয়ু দীর্ঘ হয়।সারাজীবনের যুক্তিবাদী ঈশ্বর অসহায় হয়ে, মরিয়া হয়ে কোনো যুক্তির তোয়াক্কা না করে বেশ্যাপাড়ায় যায় রক্ষিতার খোঁজে। আনাড়ি ঈশ্বর যখন পাড়ার গলিতে পথ হারিয়ে ফেলে, সন্ধ্যার অন্ধকারে এক গাড়োয়ান রাস্তায় তাকে বলে, “এই রাতের পর যখন দিন আসবে, তখন কিন্তু তুমি নিজেকে চিনতে পারবে না। কোথায় নিজেকে হারিয়ে ফেলবে জানতেও পারবে না। তবু যদি যেতে চাও, নিয়ে যাব। আমার তো এই কাজ!”

ঈশ্বর বলে, “তবে আজ আমায় বাড়ি পৌঁছে দাও। আমার বাড়ির ঠিকানায়।” ভালবাসাকে হারিয়ে যাওয়ার থেকে বাঁচাতে, ঈশ্বর ভালবাসারই গলা টিপে মারতে গিয়েছিল, ফিরে আসে ভুল বুঝতে পেরে। গাড়োয়ান হেসে বলে, “মন খারাপ করবেন না সাহাব। আপনি এখনও কিছু হারিয়ে ফেলেন নি।”

মালগুড়ি

একটা ছোট্ট স্টেশন। তাকে ঘিরে একটা ছোট শহর। সেই শহরের প্রতি অলি-গলিতে সাধারণ কিছু গল্প। কেউ ন’বার ম্যাট্রিক ফেল করে শেষ অব্দি আশা ছেড়ে দিয়ে সুইসাইড নোট লিখে রাখে জামার পকেটে, কেউ নিখুঁত মুর্তি গড়ার প্রচেষ্টায় জীবনে মহাবিপদ ডেকে আনে। এই ছোট ছোট ঘটনা, মানুষ, গল্প নিয়ে আর কে নারায়ন গড়ে তুলেছেন কল্পনার মিশেলে মালগুডি শহর। স্বাধীনতার প্রাক্কালে যেখানে স্কুলে যাওয়া ছাত্ররা অসহযোগ আন্দোলন করে, নিজেদের মধ্যে টিম গড়ে ক্রিকেট খেলতে শেখে।

আমরা আজকাল বড় অসাধারণ হয়ে উঠেছি। সাধারণ, স্বচ্ছ গল্প আমরা  অনেকদিন লিখি না। আমাদের কাছে প্রেম মানে এখন সলিটেয়ার, ড্রিম প্রোপোজাল, ডেস্টিনেশন ওয়েডিং। মন ভাঙলে নদীর পাড়ে জলে পা ডুবিয়ে বসি না, “ডিপ কোট” লিখি সোশাল প্ল্যাটফর্মে। ঊনিশশ তেতাল্লিশ সালে লেখা বইতে আর কে নারায়ন যত স্বচ্ছভাবে ভারতবর্ষকে দেখিয়েছেন, তত সচ্ছতা আজ আর কেউ দেখিয়ে দিতে পারে না সাহস করে। তাই যখন অসহযোগ আন্দোলনের উত্সাহে স্বামী নিজের মাথার টুপিটা “বিদেশি পরিধান” ভেবে আগুনে আছড়ে ফেলে, স্বামীর বাবা আদতে খাদির দোকান থেকে কিনে আনা টুপিটার জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করে। কয়েনের দুদিকের কথাই বলতে হয় লেখককে, আজকাল কি তার দায় আছে?

নূপুর চক্রবর্তী

পাশাপাশি ১৯৮৬ সালে মালগুডি ডেজ এর যখন নাট্যরূপ হয়, আদতে দক্ষিণ ভারতের প্রেক্ষাপটে তৈরি গল্পগুলি যাতে আরো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, তাই গোটা নাট্যরূপটিই অভিনীত হয় হিন্দিতে। না, তাতে অযথা কোনো দক্ষিণী টান নেই, অতিরিক্ত মেকআপ বা দাক্ষিণাত্যের কস্টিউম দিয়ে জাহির করা নেই। অার কে লক্ষণের অসাধারণ ইলাস্ট্রেশন ছোটবেলায় দেখতে দেখতে এতটাই আত্মস্থ হয়ে গেছিল যে সবকিছু জেনেও, চেন্নাই যাবার ট্রেনে উঠে এই বড়বেলায়ও মনে প্রশ্ন জাগে, ” এখানে মালগুডি বলে কোন স্টেশন নেই না?”

হয়তো ছিল কোনকালে, জীবনের ব্যস্ততায় কবে পেরিয়ে এসেছি।

নূপুর চক্রবর্তী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here