মাননীয় প্রধানমন্ত্রীজি- মে দিবসে এক শ্রমিকের খোলা চিঠি

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীজি
নয়া দিল্লি,
ভারতবর্ষ

হাঁটতে থাকা হতদরিদ্র শ্রমিক। ছবিসুত্রঃ rediff.com

আমার নাম জামালো মাকদম। বাড়ি ছত্তিসগড়। জাতে আদিবাসী। আমাকে, আমার বাপ আন্দোরাম বা মা সুকামাতি, কাউকেই আপনি চিনবেন না। আপনার কাছে আমরা শুধুই একটা সংখ্যা। সোজা বাংলায় এক একটা ভোট। ওহ্, আমার তো আবার সেটাও নেই। আমি তো মাত্র বারো বছরের। কিন্তু জানেন তো, বারো বছরের পেটেও ভুখ লাগে। পেটে আগুন জ্বালায় ভুখমারি। পেটের দায়ে বাপ-মা তার একমাত্র সন্তানকে কাজে লাগিয়ে দেয়। আমি তখন মাত্র দশ বছরের।

প্রথমে আশেপাশে কাজের ধান্দায় ঘুরতাম। কিন্তু এই নেই রাজ্যে কে আমাকে কাজ দেবে? এখানে তো আমাদের জন্য কেবলমাত্র রয়েছে মায়ের মতো জঙ্গল। বাপ-মায়ের সঙ্গে সেই জঙ্গল থেকেই কুড়িয়ে আনতাম পাতা, কাঠকুটো। কিন্তু তাতে কি আর পেট চলে, আপনিই বলুন?

অগত্যা বাড়ি থেকে অনেক, অনেক দূরে, আমার মতোই আরও অনেক সঙ্গী সাথীর সাথেই আমার ঠিকানা সেই থেকে তেলেঙ্গানা। তেলেঙ্গানার মির্চির খেতে মির্চি তোলার কাজে বহু বছর ধরেই আমাদের মতো আদিবাসীদের নিয়ে যায় আড়কাঠিরা, আমরা যাদের ঠিকাদার বলি। পেট যে বড়ো দায় হুজুর।

আমি যদি পড়তে পারতাম, বাড়ি থেকে ১১২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়ার সময়ে নিশ্চিত চোখে পড়তোই আপনার মন ভোলানো হাসি মুখের সাইনবোর্ডের নীচে আপনার সরকারের শ্রম মন্ত্রকের বিজ্ঞাপন। শিশুশ্রম দূর করার জন্য আপনার সরকার কতো প্রকল্প নিয়েছে, তার রঙচঙে ছবি আর হিজিবিজি সংখ্যা।

আমাদের কাছে জঙ্গল আমাদের মা। জানেন মালিক, আমাদের সেই মা পর্যন্ত ছাড় পায়নি আপনার হাত থেকে। আমাদের জল-জঙ্গল-পাহাড় বিক্রি হয়ে গেছে আপনার পেয়ারের আদানি-আম্বানিদের হাতে। আপনি সবই করেন আমাদের ভালোর জন্য। তাই মাওবাদী চেনার জন্য আমাদের মেয়েদের ল্যাংটো করে বুক টিপে পরীক্ষা করে দেখা হয় দুধ বেরোচ্ছে কি না। আরে আমাদের আবার মান সম্মান, আমাদের আবার মানবাধিকার। কি যে লোকে বলে কে জানে!

তাই জঙ্গল মা পেট ভরাতে পারছিলো না বলেই ঘর ছেড়ে ভিন রাজ্যে পাড়ি দেওয়া। সস্তা শ্রম, চাহিদা কম, ঠিকাদার ভি খুশ। আর দুবেলা দুমুঠো ভাত জুটে যাচ্ছিলো, তো হাম লোগ ভি খুশ। দিনভর ক্ষেতে মির্চি চারাগুলোর গোড়ায় মাটি আলগা করে দেওয়া, আগাছা সব বিলকুল সাফ করে রাখা। গাছ হলেও ওদের অনেক দাম। ওই সব মির্চির রঙ যখন লাল হয়ে আসবে, মহাজনের শান বাঁধানো চবুতরায় কড়া ধুপে সেই লাল মির্চ শুখা করে দিতে হবে। তারপর সেই শুখা লাল মির্চি যাবে কারখানায়। চাক্কিতে পেষাই হয়ে লাল রঙের প্যাকেটে ভরে সেই মির্চি ঠাঁই পাবে বাবুদের রসুইঘরে। লাল মির্চি সে বনতে হ্যায় তিখা লাল। আপনাদের হরেক কিসিমের খানায় সেই তিখা লালের বহুৎ কদর। কিন্তু মালিক, ওই তিখা লাল মির্চিতে মিশে থাকে হামাদের খুন। খুন ভি তো লালই হোতে হ্যায় না মালিক!

মির্চি তোলা, শুখাই হয়ে গেলে ঠিকেদার হাম লোগোঁকো রুপেয়া দেতে হ্যায়। যিসকা যো মজদুরি বনতা হ্যায়। আর দেখো উসমে ভি মিলাবট। ঠিকেদার হামেশা বাহানা বানাকে রুপেয়া কাট লেতে হ্যায়। আরে হাম লোগ থোড়ি না কোই ইনসান হ্যায়। হামলোগ তো কুত্তা বিল্লি য্যায়সা হি হ্যায়। তো হাম লোগোকা কেয়া শুননা।

জনতা কার্ফু যেদিন হলো, তারপর থেকেই ঠিকেদার উধাও। বিলকুল লা পাতা। তবুও বেশ কিছু দিন আধপেটা খেয়ে, না খেয়ে আমরা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। তেলেঙ্গানার পেরুরু গ্রাম, যেখানে খেতে আমরা কাজ করতাম, সেই খেতের মালিক জানিয়ে দিলো কবে থেকে আবার কাজ শুরু হবে, তা কেউ জানেনা। তাই সেইদিন রাতেই বড়োরা মিলে ঠিক করলো গ্রামে ফিরে যাওয়ার। কেউ কেউ পৌঁছাতে পারবো কি না প্রশ্ন করায় বাকিরা তাদের ভরসা দিলো। ঠিক পারবো আমরা। ছোট্ট ছোট্ট পায়ে ঠিক পৌঁছে যাবো আমাদের ছত্তিসগড়। হামরি গাঁও, হামরি ঘর।

হাঁটতে থাকা পরিযায়ী শ্রমিক। ছবিসুত্র- ইন্টারনেট

১৬ ই এপ্রিল ভোর হওয়ার আগেই আমরা হাঁটতে শুরু করলাম। কুল মিলাকে দশ আউরত ওউর তিন বাচ্চা। হাম ভি সামিল থে উস টোলি মে। দিনমে তেজ ধুপ ওউর ভুখা পেট। তবুও হাঁটতে লাগলাম জান তৌড় কে। ষোলা ওউর সতরা তারিখ সির্ফ পানি হি মিলা পিনে কা। খানে কা কুছ নেহি। অনেক পথ পেরিয়ে এলাম এই দু’দিনে। ১৮ই এপ্রিল সকাল থেকেই আর পারছিলাম না। পেটে অসহ্য যন্ত্রণা করছে। মনে হচ্ছে যেন আর বাঁচবো না। চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। কে যেন বললো গাঁও জাদা দূর নেহি। সির্ফ দশ কিলোমিটার।

মেরা গাঁও, মেরা ঘর। দ…শ…কি…লো…মি…টা…র!

হে ভগবান, হামে রকষা করো প্রভূ। হে রামজি, হামে বাচাও প্রভূ। হামে আপনি ঘর পৌঁছা দো। পা ভেঙে আসছে, বুক ফেটে যাচ্ছে… মা, ওউর কিতনি দূর যানা হ্যায় হামে। ইস নানহি সি জান কো ওউর কিতনি কষ্ট উঠানে পড়েঙ্গে…………………………………………!

কিঁউ কি ভুখ সে মরনেওয়ালো কভি মৌত সে ডরতে নহী।

 

আদরনীয় প্রধানমন্ত্রীজি,

বিশিষ্ট রক্তযোদ্ধা- অনুপম ভট্টাচার্য

লাশকাটা ঘরে ওই যে শতচ্ছিন্ন পোশাক পরা বাচ্চার লাশটা পড়ে আছে, ওই যে নাক থেকে, ঠোঁটের কষ থেকে রক্ত বেরিয়ে শুকিয়ে কালচে ছোপ ধরে আছে, ওর কোনও নাম নেই। ওই শবদেহ আসলে এদেশের অর্থনীতির। ১৯৪৭ সালের ১৫ ই আগষ্ট থেকে যে হাঁটতে শুরু করেছে। পথ চলতে চলতে আজ সে মুখ থুবড়ে গাছতলায় পড়ে আছে।

আজ পয়লা মে দেশের শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে ইথারে হয়তো ভেসে আসবে আপনার বাণী। দেশের মানুষের জন্য আপনার আত্মত্যাগ। কিন্তু মনে রাখবেন স্যার, জনতা জনার্দন কিন্তু সব কিছু দেখছে। হিসাব নেওয়া যে কবে থেকে শুরু হবে, আপনি ধরতেও পারবেন না।

 

লেখক: বিশিষ্ট রক্তযোদ্ধা অনুপম ভট্টাচার্য

1 COMMENT

  1. পড়েছি , মনেহয় এই মেয়েটাই গ্রামের মাত্র কয়েক কিলোমিটার আগেই আর শরীর দেয়নি বলে রাস্তাতেই পড়ে মারা যায় ৷ আর প্রধানমন্ত্রী তার বিশ্বস্ত জনা পঞ্চাশেক স্যাঙাৎদের জনগনের লক্ষ-কোটি মেরে দেওয়া টাকা মকুব করে দেন ! এর ভগ্নাংশও যদি ঐ পরিযায়ী দলটার মত সারা দেশে অসংখ্য খেটে খাওয়া মানুষদের জুটতো তাহলে ভুখা পেটে দিনের পর দিন হেঁটে এইভাবে মরতে হতোনা ৷ নিরন্ন লক্ষ লক্ষ মানুষ হেঁটে হেঁটে বাড়ির পথে আর মন্ত্রীরা মজা মারছেন আর লক ডাউন বাড়িয়ে চলেছেন খাদ্যের ব্যবস্থা না করে ৷ এ পাপ কবে যে বিদেয় হবে !

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here