বাংলা সন বা বঙ্গাব্দ: উৎপত্তির ইতিহাস

বাংলা সন বা বঙ্গাব্দ বঙ্গদেশের একটি ঐতিহ্যমণ্ডিত সৌরপঞ্জিকা ভিত্তিক বর্ষপঞ্জি। এতে জড়িয়ে আছে প্রাচীন শকাব্দ, ইসলামি হিজরি এবং খ্রিস্টীয় গ্রেগরিয়ান বর্ষগণনার ঐতিহ্য। সূর্যের চারিদিকে পৃথিবীর একবার ঘুরে আসতে সময় লাগে ৩৬৫ দিন ঘন্টা ৪৮ মিনিট ৪৭ সেকেন্ড। মোটামুটি ৩৬৫ দিনের বছর হলো সৌর বছর। আর, একে ভ্যন্দ্র, দুয়ে পক্ষএর চাঁদের দুই পক্ষে মাস ধরলে, বছর হয় ৩৫৪ দিনে। এটা চান্দ্র বছর। ফলে বছরে ১১ দিন করে এগিয়ে আসে চান্দ্র বছরে ঋতুচক্র ঠিক থাকে না। মোগল সম্রাট আকবরের সময়ে তাঁর মতো বহুত্ববাদী চেতনায় বিশ্বাসী সম্রাট তাঁর দীনইলাহী মতো বিভিন্ন ক্যালেন্ডারের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের দরকার পড়লো। যদিও রাজভাষা ফারসি, ফারসি ক্যালেন্ডার অনুসারে নওরোজ পালিত হতো, তেমনি বর্ষ গণনা হতো হিজরি সন অনুসারে।

তিনি বিভিন্ন ক্যালেন্ডারের মধ্যে সামঞ্জস্য চাইলেন কেন? এর একটা আশু প্রয়োজন দেখা দিল এবং সমস্যা সনাক্ত করেন তাঁর অর্থসচিব রাজা টোডর মল। কিন্তু বর্ষ গণনায় এই কথা আজও অনুক্ত রয়েছে। তিনি দেখান, রাজস্ব সংগ্রহে অসুবিধার কথা। ভারত যে কৃষিপ্রধান দেশ, রাজস্ব সংগ্রহে প্রজাদের ফসল তোলার সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। তাছাড়া, আকবরের সভাসদ আবুল ফজল রীতিমতো অঙ্ক কষে দেখিয়ে দেন, ৩২ টি সৌর বছরে হিজরি হয় এক বছর বেড়ে গিয়ে ৩৩ বছর। প্রজাদের বছরের রাজস্ব বেশি দিতে হচ্ছে।
আকবর এই সমস্যা নিরসনে ফারসি জ্যোতির্বিজ্ঞানী আমির ফতহুল্লাহ শিরাজীকে দায়িত্ব দেন। চান্দ্র সৌর বছরের সামঞ্জস্য বিধানের। সময়টা ছিল ৯৯২ হিজরি, ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দ।

ফতহুল্লাহ শিরাজীর সুপারিশক্রমে আকবরের সিংহাসন আরোহণের বছর ১৫৫৬ খ্রি ছিল ৯৬৩ হিজরি। ৯৬৩ হিজরির প্রথম মাস মুহররম ছিল বৈশাখ মাস।
৯৬৩কে চান্দ্র বছর না ধরে এটিকে সৌর বছরে রূপান্তরিত করা হল। অর্থাৎ এর পর থেকে বছরগুলো বাংলা সন হিসেবে গণ্য হতে লাগলো। এটা হলো তারিখইলাহী। কিন্তু মাসের নাম ফারসি ক্যালেন্ডারের মতো ফরওয়ার্দিন ইত্যাদি না হয়ে রাখা হলো শকাব্দের মতো বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ ইত্যাদি। তাঁর পৌত্র শাহজাহান রবিবার থেকে সপ্তাহের দিনও শুরু করেছিলেন। এখন দেখুন, যেমন
১৫৫৬৫৯৩=৯৬৩,
তেমনি ২০২০৫৯৩= ১৪২৭ সন।

বাংলা তারিখ লিখনের ক্ষেত্রে কবি লেখকদের ভনিতায় বা দলিল লিখিয়েদের দস্তাবেজে সন ১৪২৭ সাল, অর্থাৎ সন (আরবি) সাল (ফারসি) — দুটোই লেখা হয়ে থাকে। অথচ বঙ্গাব্দ আধুনিক প্রয়োগ ছাড়া নেই বললে চলে। তাই, বাংলা বর্ষ গণনায় মোগল দরবারের প্রভাবের কথা কিছুতেই অস্বীকার করা যায় না।

কিন্তু কেউ কেউ গৌড়ের রাজা নামে সমধিক পরিচিত রাজা শশাঙ্কের সঙ্গে বঙ্গাব্দ সূচনার কথা বলেন। তাঁদের মতে শশাঙ্ক বঙ্গাব্দের সূচনাকারী।
কেউবা বলেন, হুসেন শাহ বঙ্গাব্দের সূচনা করেছিলেন।

সুখময় মুখোপাধ্যায় দেখিয়েছেন, কোন কোন পুঁথিতেযবনে নৃপতে শকাব্দবা রামগোপাল দাসেররসকল্পবল্লী পুঁথিতেযাবনী বৎসরবলা হয়েছে। তবে এর দ্বারা নিশ্চিতভাবে হুসেন শাহকে বঙ্গাব্দের সূচনাকারী বলা যায় না। এর পর তাঁর উপসংহার এরকম যে, বঙ্গাব্দের প্রবর্তক যে কে, তা যখন জানা যাচ্ছে না, তখন তাকে বাংলার প্রথম প্রতাপশালী রাজা শশাঙ্কের চিহ্নিত করলে ক্ষতি কি? ( সুখময় মুখোপাধ্যায়, এক্ষণ, শারদীয় সংখ্যা, ১৪০৯)

লক্ষণীয়, আমরা যেমন ফেসবুকে কারো নাম ট্যাগ করি, সেরকমভাবে বাংলা সন বা বঙ্গাব্দের ইতিহাস রচনা করতে গিয়ে কোন কোন রাজা বা রাজচক্রবর্তীর সঙ্গে ট্যাগ করছেন না কি মাননীয় ঐতিহাসিক?

ঐতিহাসিক ব্রতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় তাঁরবঙ্গ, বাঙ্গালা ভারতগ্রন্থে শশাঙ্ক কে বঙ্গাব্দের প্রবর্তক বলতে চাওয়া প্রসঙ্গে বলেন, ” এই মতের সপক্ষে কিছু বলতে গেলে প্রথমেই প্রমাণ করতে হবে যে, শশাঙ্ক ৫৯৪ খ্রিস্টাব্দে এক শব্দহীন রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বা অন্তত এই সময়ে স্বাধীনভাবে রাজত্ব করেছিলেন। এর কোন নিশ্চিত প্রমাণ নেই, যদিও খ্রিস্টীয় ৭ম শতাব্দীর প্রথম ভাগে তাঁর রাজত্ব সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্য আমাদের আছে।শশাঙ্কের রাজ্যের সর্বাপেক্ষা বিস্তৃত সীমানার মধ্যে তাঁর পরবর্তীকালীন এক হাজার বছরের মধ্যে তারিখযুক্ত যে বিরাটসংখ্যক লেখ আবিষ্কৃত হয়েছে, সেগুলিতে বঙ্গাব্দ ব্যবহারের চিহ্নই নেই।” (১৫২১৫২)

আগেই বলেছি, কে না জানে, শশাঙ্ক ছিলেন গৌড়ের রাজা। প্রায়ই কথিত হয়ে থাকেগৌড়ের রাজা শশাঙ্ক“! তাহলে কেনইবা তাঁর প্রচলিত বছরের নাম হবেবঙ্গাব্দ“? কেন গৌড়াব্দ হলো না ?
অমর্ত্য সেন যথার্থই বলেছেন
আকবরের সমন্বয়ী প্রচেষ্টা ভারত ইতিহাসে এক স্থায়ী পরিচিহ্ন রেখে যাবে। একসময় যা ছিল ফসলি সন, তাই হয়ে উঠলো বাংলার সন, বঙ্গাব্দ।

“There is a surviving calender, the Bengali San, which clearly influenced by Tarikh-ilahi, and which still carries evidence of the integrating tendency that is so plaintifully present in many other fields of Indian culture and tradition (such as painting, architecture, and so on…. When a Bengali Hindu does religious ceremonies according to the local calender, he or she may not be quite aware that the dates that are invoked in the Calendrical accompaniment of the Hindu practices are attuned to commemorating Muhammad’s journey from Mecca to Medina, able it in a mixed lunar-solar representation.” (Argumentative Indian : Writings on Indian History, Culture and Identity; Ed. Penguin, 2005, p. 331-332)

নীয় ক্যালেন্ডারের ভিত্তিতে যখন কোন হিন্দু পুরুষ বা মহিলা কোন ধর্মীয় আচার বা ধর্মীয় কৃত্য পালন করতে যাবেন, তখন তার সঙ্গে হজরত মুহাম্মদ ()-এর মক্কা থেকে মদিনা যাত্রার সুর ধ্বনিত হতে থাকবে। আর এটা হবে চান্দ্রসৌর বছরের মিশ্র উপস্থাপনায়।

লেখকঃ বিশিষ্ট অধ্যাপক ডঃ সাআদুল ইসলাম,
তিলপি, . ২৪ পরগনা,পিন – 743337,Ph. 9733639952

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here