মিনি পাকিস্তানে অনুপম ভট্টাচার্য

সেটা ১৯৮৮-৮৯ হবে, একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করার সুবাদে প্রথম যাতায়াত শুরু হয় সিগারেট কল – বাঁধা বটতলা অঞ্চলে। ওখানেই কোম্পানির মালিকের বাড়ি। মালিকের ভাই প্রায়
সম বয়সী হওয়ায় দুজনের ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিলো। তাই কাজের শেষে টাকা পয়সার হিসাব বোঝানোর জন্য যেদিন ওই অঞ্চলে যাওয়া হতো, সেদিন কাজ মিটে যাওয়ার পরেও মালিকের ভাইয়ের সাথে খানিক আড্ডা হতো। বামপন্থী পরিবার। ওই এলাকার মুকুট হীন সম্রাট যাকে বলা হতো, সেই দিলীপ সেনের ঘনিষ্ঠ বৃত্তে এদের পরিবারের অবস্থান। একদিন এমনই আড্ডা মারছি, এমন সময়ে মালিকের ভাই একটা অদ্ভুত কথা বললো। খুব আস্তে আস্তে আমায় বললো, “জানিনা এখানে আর কদ্দিন হিন্দুরা সেফলি থাকতে পারবে! এখানকার কাটুয়ারা ধীরে ধীরে সব দখল করে নেবে। এই জায়গাটাকে ওরা মিনি পাকিস্তান বানিয়ে ছাড়বে। আজ এখানকার গাণ্ডু হিন্দু গুলো বুঝতে পারছে না, একদিন এদের ঘর থেকে মেয়ে, বৌ টেনে বার করে নিয়ে যাবে এই মোল্লারা। তুই মিলিয়ে নিস আমার কথা।”

এরপরে আর খুব বেশিক্ষণ আড্ডা চলেনি। কিন্তু প্রথম শোনা “মিনি পাকিস্তান” শব্দবন্ধটি মাথায় গেঁথে গেছিলো। কিন্তু নিজের অভিজ্ঞতার সাথে মিলিয়ে দেখলে কিছুই সাজুয্য পাচ্ছিলাম না। একটু খুলে না বললে পাঠকদের ধরতে সমস্যা হবে। যে অঞ্চলে আমার বেড়ে ওঠা, বুড়ো হয়ে ওঠা, সেই অঞ্চলে হিন্দু-মুসলিম জনসংখ্যার অনুপাত ৫০ঃ৫০র কাছাকাছি হবে। ল্যাংটা বয়স থেকে লালু, কালু আদি যাদের সাথে খেলাধুলা, লোকের বাড়ি চুরি করে রস খাওয়া, ডাব খাওয়া বা সরস্বতী পুজো করা, জানা ছিলো না তাদের অনেকেরই একটা করে আরবি নামও আছে। খেলতে খেলতে তেষ্টা লাগলে যার বাড়িতেই হোক ঢুকে এক গ্লাস জল দাও তো বলে হাঁক পাড়তে কখনোই কেউ দ্বিধা করেনি। কিংবা রাত জেগে সরস্বতী পুজোর প্যান্ডেল বানাতে বা তার আগে মাস খানেক ধরে চাঁদা তোলার জন্য বাড়ি বাড়ি হানা দেওয়ার সময়ে কোনও বাড়িকে ছুট দেওয়া হতো না। কারোর মনে এই প্রশ্ন কখনো এসেছে বলে মনে হয়না যে এরা হিন্দু, এরা সরস্বতী পুজোয় চাঁদা দেবে আর ওরা মুসলিম, ওরা সরস্বতী পুজোয় চাঁদা দেবে না। কেউ চাঁদা না দিলে বাইরে বেড়িয়ে গুছিয়ে খিস্তি দেওয়ার সময়েও আমাদের আরবি নামধারী বন্ধুদেরও কখনোই জাতের প্রশ্ন মাথায় আসেনি। যারা চাঁদা দিতেন না, সেটাকে তাদের আর্থিক অক্ষমতা অথবা কিপটেমি, এই দুই ভাগে ভাগ করে খিস্তির মাত্রা নির্ধারিত হতো।

লক্ষ্মী পুজোর খিচুড়ি ভোগ খেতে কালু আমাদের বাড়ি এলে কেউ তার জাতের ঠিকানা জানতে যেমন চাইতো না, তেমনি কালুর মায়ের বানানো ঈদের সিমাইয়ের ভাগ পাওয়ার জন্য আমাকে জাত খোয়াতে হয়নি। আমার বিশ্বাস কালুর জাতও যায়নি। মানুষের বুকের মধ্যে অনেক ছোট ছোট কুঠুরি থাকে। “আট কুঠুরি, নয় দরজা আঁটা। মাঝে মাঝে ঝরকা কাটা। তার ওপরে সদর কোঠা, আয়না মহল তায়”… বুকের মধ্যের এই খুদে কুঠুরির কোনটায় কে বাস করে, তার খোঁজ রাখে কয়জনে?

ছোট থেকে বেড়ে ওঠার ধাপে ধাপে মানুষের মনেও আবাদি চলে। কেউ ভালোবাসার বীজ বোনে, কেউ ঘেন্নার। আর এই পতিত মানব জমিনে অনুকূল জল হাওয়ায় বীজ থেকে অঙ্কুর বেড়োয়। খোলার দেওয়াল ফাটিয়ে ভালোবাসা বা ঘেন্নার চারাগাছ মাথা চাড়া দেয়। জল, সার পেয়ে সে চারাগাছ একদিন মহীরুহ হয়ে সম্পর্কের ভিত ফাটিয়ে দেয়। ধ্বসে যায় আবহমান কালের সম্প্রীতির আয়না মহল।

(২)

আমাদের খেলাধুলা আর বদমায়েশি করার জায়গা ছিলো মসজিদ আর তার খুব কাছের দরগা। দরগার মাঠে ফুটবল পেটানো থেকে বাতাবি লেবু, আম,জাম চুরি করে খাওয়া ছিলো নিত্যকার কাজ। মসজিদের পুকুরে ছিপ দিয়ে মাছ ধরা, ঘন্টার পর ঘন্টা জলে চুবুনি, সে এক স্বেচ্ছাচারের চূড়ান্ত ছিলো আমাদের। আর এই দস্যিপনার পেছনে মদত ছিলো আমার ইমাম সাহেবের। ইমাম সাহেবের স্মৃতিতে একটা লেখা দিয়েছিলাম। ওনাকে নিয়ে লিখতে বসলে মহাভারত লেখা হয়ে যাবে।

 

আমার খুব ছোটবেলায় আমার ঠাকুরদা মারা যান। ইমাম সাহেবের মধ্য দিয়েই আমি সেই না পাওয়া ঠাকুরদার স্নেহ মায়ার আস্বাদ পেয়েছি। আমার বুকের খাঁচার এক সোনার কুঠুরিতে আমার ইমাম সাহেবের স্মৃতি সযত্নে ধরে রাখা আছে। সে স্মৃতিতে সময়ের ধুলো জমলে স্মৃতি চারণের ঝাড়ন দিয়ে সময়ে সময়ে সেই ধুলো ঝেড়ে উল্টেপাল্টে দেখি। আর আমার মন খারাপের পাখি ফুরুৎ করে উড়ে পালায়।

তখন কতোই বা বয়স হবে, আট কিংবা নয়। সেই থেকে দুই অসম বয়সী মানুষের বন্ধুত্বের শুরুয়াত। ইমাম সাহেবের সম্পত্তি বলতে খান চারেক পাঞ্জাবি আর লুঙ্গি। আর খান দুই ফেজ টুপি। একটা পাঞ্জাবি ছিলো বেশ ঝলমলে, রঙদার। আর ছিলো একটা জনতা স্টোভ আর খান কয়েক থালা বাসন। স্কুল ফেরত নাকেমুখে দুটি গুঁজে আমি এক ছুট্টে দরগার মাঠে। বন্ধুবান্ধব জুটিয়ে কোনো দিন বল পেটানো বা কাঠ কেটে বানানো ব্যাট বল নিয়ে খুদে শচীন তেন্ডুলকারের কেরামতি।

মাঝেমধ্যে ছিপ দিয়ে মসজিদের পুকুরে মাছ ধরা। মাছ ধরতে গিয়ে চোখে পড়তো ইমাম সাহেবের গৃহস্থালির গল্প। নমাজ পড়তে এসে কেউ কেউ বাড়িতে ভালো মন্দ রান্নার ভাগ দিয়ে যেতেন ইমাম সাহেবকে। সেই খাবারের সিংহভাগই যেতো আমার আর কালুর পেটে। কিন্তু কালেভদ্রে যেদিন বিফ রান্না হতো সেদিন শত অনুরোধেও ইমাম সাহেবের মন গলতো না। কেবলই বলতেন, “ও কচি, তুমি বামুনের ছেলে। তোমায় কি আমি গোস দিতে পারি? আমার গুণা হবে না?”

আমার চোখের সামনেই ইমাম সাহেবের দাড়িতে সাদা ছোপ ধরলো। টানটান মেদহীন চেহারায় বয়সের আঁচড় পড়লো ভালোই। ঈদের দিনে ইমাম সাহেবকে দারুণ লাগতো। সারা বছর যাহোক তাহোক করে দিন কাটালেও ঈদের দিন ইমাম সাহেবের বাদশাহি মেজাজ। দাড়িতে মেহেন্দি, চোখে সুরমা আর কানে আতর মাখা তুলো গোঁজা। নতুন লুঙ্গি, ঝলমলে পাঞ্জাবি আর ফেজ টুপিতে ইমাম সাহেবকে কোনও মুঘল সম্রাটের থেকে কম মনে হতো না।

“কেয়া তন মাঞ্জতা রে একদিন
মাটি মে মিল যানা
পবন চলে উড় যানা রে পাগলে
সময় চুক পচতানা…”

ইমাম সাহেব যেদিন চলে গেলেন, সেদিনটা আমার খুব মনে আছে। কালু দৌড়ে এসে খবর দিলো ইমাম সাহেবের এন্তেকাল হয়েছে। আকাশ জুড়ে কালো মেঘের ভেলা ভাসিয়ে দিয়েছে। আর মাঝে মাঝে বুক কাঁপানো বিদ্যুৎ চমক। মনে হচ্ছে আকাশ যেন দুঃখে কষ্টে ভেঙে পড়বে। ইমাম সাহেবের মরদেহ নিয়ে নীরব মিছিল চলেছে কবরস্থানের দিকে। আমিও চলেছি সেই মরদেহ বয়ে নিয়ে। পথে ভীড় করে লোকজন দাঁড়িয়ে। সকলের চোখ ছলছল করছে। আমার মাথা কাজ করছিলো না। আপনজন হারানোর যন্ত্রণা কি, তার সম্যক উপলব্ধি হলো সেদিন।

(৩)

নাসের আমার সহকর্মী কাম ভাই। ওর পড়াশোনার গভীরতা, সহজ সরল ভাষায় নিজেকে এক্সপ্রেস করার ক্ষমতা আমাকে টানতো। তাই অফিসের ফাঁকে প্রায় রোজই চা খাওয়ার অজুহাতে আড্ডা দেওয়াটা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলো। সেই আলাপের রেশ ধরেই একদিন পা রাখলাম মেটিয়াবুরুজে। মেটিয়াবুরুজ শুনলেই আপনার মনে পড়বে নবাব ওয়াজিদ আলী শাহ আর তাঁর গজলের কথা। “বাবুল মোরা নইহর ছুটো হি যায়েঁ। চার কাহার মিলে মোরা ডোলি সাজাবেঁ। মোরা আপনা বেগানা ছুটি যায়েঁ। বাবুল মোরা নইহর ছুটো হি যায়েঁ”। ওয়াজিদ আলী শাহ মানে আর যেটা মনে আসবে তা হচ্ছে নবাবি খাতিরদারি।

প্রথম মিটিং টা হয় শামসুদ্দিন পুরকায়েতের স্কুল বাড়িতে। পরিচয় পর্বে খটমটে আরবি নামের সাথে ধাতস্থ হতেই অনেকটা সময় চলে গেলো। বিস্তারিত আলোচনা পর্বের পরেও আমাদের মাঝে একটা কাঁচের দেওয়াল কিন্তু অনুভব করতে পারছিলাম। সে দেওয়াল দেখা না গেলেও প্রতি পদেই মালুম পাচ্ছিলাম তার উপস্থিতি। হঠাৎই মনে পড়ে গেলো আমার প্রাক্তন মালিকের ভাইয়ের সেই কথা। তবে কি আমারই ভুল ধারণা ছিলো। সত্যিই কি ” মিনি পাকিস্তান”? মিটিং যে উদ্দেশ্যে ডাকা হয়েছিলো, সেটা সাকসেসফুল হলেও মনের মধ্যে কোথাও একটা কাঁটা বিঁধে গেলো, যার অস্তিত্ব বাইরে থেকে বোঝা না গেলেও ভেতরে ভেতরে রক্তাক্ত হচ্ছিলাম। এতোদিনের সযত্ন লালিত স্মৃতিতে একটা চিড় দেখতে পাচ্ছিলাম।

পরবর্তী দাওয়াত আসে অল্পদিনের ব্যবধানে। শামসুদ্দিন স্যারের বাড়িতে। প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি শামসুদ্দিন পুরকায়েত বাচ্চাদের জন্য একটি স্কুল চালানোর সুবাদে এলাকায় ইউনিভার্সাল শামসুদ্দিন স্যার হিসাবেই খ্যাত। সেই দাওয়াত রক্ষা করতে এক দঙ্গল ভীড় করলাম শামসুদ্দিন স্যারের বাড়িতে। দাওয়াতে প্রধান আইটেম বিরিয়ানি। ভাবিজী নিজে হাতে বানিয়েছেন সেই অমৃত। খাওয়ার পর্ব শেষ হবার পরে শুরু হলো আড্ডা।

ভাবিজী এলেন আলাপ করতে, সঙ্গে ছেলের বৌ আর নাতনী। এরা তো বিলকুল আমার মা,দিদি, বোনের মতোই ঘরোয়া। কিছুক্ষণের মধ্যেই নাতনী আর আমার বন্ধুত্ব জমে গেলো। সে জামাকাপড় পোঁটলা বেঁধে আমার সাথে আসবে। শামসুদ্দিনদা খুব আড্ডা প্রিয় বাঙালি। শ্বশুর বাড়িতে সকলে ওকে শ্যাম দা বলে ডাকে। শ্যাম দা? সে তো হিন্দু নাম!! শামসুদ্দিনদা গল্প করছিলেন ওর ধরম মায়ের। ওনার ধরম মা জাতে হিন্দু। হিন্দু ধরম মা? লোকটা বলে কি?

তারপর থেকে গঙ্গা দিয়ে কয়েক কিউসেক জল গিয়েছে। এরশাদ আলী মোল্লার খোলস ফুঁড়ে বেড়িয়ে এসেছে দুলাল; কিংবা সাবির হাসান সর্দার হয়ে গেছে টিঙ্কু। আসলে আপনি যতক্ষণ পর্যন্ত কারোর অন্তর ছুঁতে পারছেন, বিভেদের দেওয়াল টা আপনি অনুভব করবেন। কিন্তু একবার যদি আপনি এই কাজে সফল হয়ে যান, তখন আর নারকেলের শক্ত খোলা নয়, তার ভেতরের অমৃত আপনার নাগালে। আর মহাপুরুষেরা তো কবেই বলে গেছেন, কারোর হৃদয়ে পৌঁছানোর সহজ রাস্তা তার পাকস্থলীর পথে। আর এই খানাপিনার মেহমান নওয়াজিতে মেটিয়াবুরুজের সাথে ভারতের অন্য কোনও এলাকা ধারে কাছেও আসবে না।

খানাপিনা এবং আতিথেয়তা প্রসঙ্গে একটা মজার অভিজ্ঞতা বলি। আমাদের কাজের বিষয়ে একটা জরুরি মিটিং ছিলো শামসুদ্দিনদার স্কুলে। পাঁচটা বাজার আগেই পৌঁছানোর কথা। কিন্তু আমার আলস্য যথারীতি লেটলতিফ অপবাদ ঘোচানোর পথে বাধা হয়েই দাঁড়ালো। তারাতলায় যখন পৌছলাম ঘড়ির কাঁটা তখন প্রায় পাঁচটার ঘরে। অগত্যা বাধ্য হয়েই উবার বুক করতে হলো। খুব দ্রুতই গাড়ি এসে গেলো। কমবয়সী ড্রাইভার। গাড়ি ছাড়তে টুকটাক আলাপচারিতা থেকে জানলাম ওর নিজেরই গাড়ি। দমদমের দিকে কোথাও থাকে। গাড়ি চলেছে স্বাভাবিক গতিতে, সাথে সাথে ড্রাইভারের কথাও। ছেলেটি বেশ মিশুকে। না জিজ্ঞাসা করতেও নিজের সম্পর্কে অনেক কিছুই শেয়ার করে ফেললো।

নেচার পার্কের পাশ দিয়ে বাঁক নিয়ে সন্তোষপুর রেল গেট ক্রস করার পরেই বিরাট জ্যাম। শম্বুক গতিতে গাড়ি এগোচ্ছে, সাথে অনর্গল চলেছে ড্রাইভার ভাইয়ের মুখ। সার সংক্ষেপে এটাই, “এই মোল্লাদের জন্যই আজ আমাদের এই দুর্দশা। এরা কারোরই কথা শোনেনা। নিজেদের জাতের লোক ছাড়া কারোর জন্যই কিছু করেনা….”। গন্তব্যের খুব কাছে এক মসজিদের মাঠে একজন ভাষণ দিচ্ছিলেন। বিজেপি মানুষের কিভাবে ক্ষতি করছে, কেন বিজেপির বিরোধিতা করা উচিত, এই সব নিয়ে। এইবার ড্রাইভার ভাইকে দেখলাম খুব উত্তেজিত। বুঝলাম কোথাও একটা আঘাত লেগেছে।

গন্তব্যে পৌঁছে ড্রাইভার ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম যে হাতে সময় আছে কি না? আজকের মতো ট্রিপের কোটা কমপ্লিট শুনে অনুরোধ করলাম কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে যাওয়ার জন্য, যাতে আমি ওর সাথেই ফিরে যেতে পারি। ছেলেটির অবস্থা তখন সাপের ছুঁচো গেলার মতো। না পারছে গিলতে, না পারছে ওগড়াতে। খানিক ভয় আর খানিক দ্বিধা নিয়ে গাড়ি লক করে এগিয়ে এলো আমার সাথেই। ঘড়িতে তখন প্রায় ছ’টা বাজে। আমাকে দেখতে পেয়েই সব হৈ হৈ করে এসে জড়িয়ে ধরলো। ড্রাইভার ভাইয়ের সাথে সকলের পরিচয় করিয়ে দিলাম। সকলে আন্তরিক ভাবে স্বাগত জানালো। আমাদের কাজের কথা শেষ হতে খুব জোর আধঘন্টা। তারপর শুরু হলো খানাপিনা। রকমারি সরবত, সিমুই আর লস্যির বাহুল্যে পেট ফেটে যাওয়ার উপক্রম। তারপর এলো মিষ্টি। আমার পেটে তখন আর তিলমাত্র জায়গাও নেই। কিন্তু কে শোনে কার কথা। সব মিটিয়ে যখন আবার গাড়িতে উঠলাম, ঘড়ির কাঁটা তখন প্রায় দশটার ঘরে। ফেরার সময়ে ড্রাইভার ভাইয়ের মুখ ঝকমক করছে। তার সরল স্বীকারোক্তি, ” এমন মানুষও হয়। আমি এদ্দিন সত্যিই ভুল বুঝতাম”। শুরুতেই বলেছিলাম, হৃদয় জয়ের সংক্ষিপ্ত পথ পাকস্থলী দিয়ে, আবার প্রমাণিত হলো।

(৪)

মেটিয়াবুরুজের কথা লিখতে বসলে শেষ করা সমস্যার। এতো এতো স্মৃতি, ভালোবাসার কথা, সে কি আর দু’চার পাতায় ধরানো যায়? ভারতবর্ষের অন্যতম বড়ো রেডিমেড গারমেন্টস উৎপাদিত হয় মেটিয়াবুরুজ কে কেন্দ্র করে। চটা মহেশতলা, আকড়া, মেটিয়াবুরুজ হয়ে গঙ্গার ওপারে উলুবেড়িয়া, আমতা, সাঁকরাইল… বিরাট এলাকার কয়েক লক্ষ পরিবার যুক্ত এই রেডিমেড গারমেন্টস উৎপাদনের সাথে। ওস্তাগর, কাটিং মিস্ত্রি এরাও যেমন আছে, তেমনি বহু মানুষের অন্ন জোগাড় হয় বোতাম স্টিচিং, হেমিং আরও অনেক ছোট ছোট কাজ করে। সরকারি কোষাগারে প্রভূত অর্থের জোগান দিলেও রাজ্য বা কেন্দ্র, কোনো সরকারেরই মাথা ব্যথা নেই এই ব্যবসা এবং এর সাথে যুক্ত মানুষদের জীবন জীবিকার উন্নয়নে।

রেডিমেড গারমেন্টসের কাঁচা মাল, অর্থাৎ থান কাপড়ের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে মারোয়াড়ী ব্যবসায়ীরা। থান কাপড়ের গুদাম গুলিতে কোটি কোটি টাকার কাঁচা মাল রয়েছে। এই প্রসঙ্গে নাসেরের থেকে শোনা একটা অভিজ্ঞতা শেয়ার করি। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের সময়ে যখন কমিউনাল টেনশনে সারা দেশ জুড়ে হানাহানির বাতাবরণ, তখন খিদিরপুর অঞ্চলের অবাঙালি মুসলমানদের একটা অংশ টার্গেট করে মেটিয়াবুরুজ অঞ্চলে মারোয়ারী ব্যবসায়ীদের কাপড়ের গুদাম লুঠ করার। সেই খবর পেয়ে এলাকার বাঙালি মুসলমান ভাইয়েরা রুখে দাঁড়ায় এদের বিরুদ্ধে। এই সক্রিয় প্রতিরোধের সামনে মাথা নত করতে হয় লুঠেরাদের। যাওয়ার আগে তারা এদের “কৌম কে দুশমন” বলে চিহ্নিত করতে দ্বিধা করে না।

ভালোবাসা বিস্তারে মেটিয়াবুরুজ কখনোই হারেনি। আজ যখন দেশ জুড়ে লকডাউন চলছে, প্রান্তিক মানুষগুলো দুমুঠো অন্নের জন্য চিন্তিত, মেটিয়াবুরুজ তাদের পাশে আছে। বিপন্ন মানুষের কোনও জাত নেই, আবার প্রমাণ করে দিলো মেটিয়াবুরুজ। আজ যখন কেউ মেটিয়াবুরুজকে “মিনি পাকিস্তান” বলে, আমি বুক ঠুকে বলি জন্ম জন্ম আমি এই মিনি পাকিস্তানের নাগরিক হতে চাই।

লেখক অনুপম ভট্টাচার্য ( রক্তযোদ্ধা নামে পরিচিত বিশিষ্ট সমাজসেবী)

3 COMMENTS

  1. লেখাটা অনবদ্য হয়েছে ৷ গতকাল প্রথমে পড়েই আগে কপি করে বন্ধুদের কাছে চালান করার হুড়োহুড়িতে এখানে কমেন্ট করার কথা ভুলেই গেছিলাম ৷ আর কমেন্ট করার মত আছেটাই বা কি ! আছে শুধুই মুগ্ধতা ৷ নতুন হাইব্রিড ওয়েবজিনের খবর দিগবিদিকে ছড়িয়ে পড়ুক ৷

  2. একটা রুপকধর্মী গল্প

    X – সকালে এবড়ো খেবড়ো , কাঁচা, আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে (জীবন) , বাড়ি তে বৃদ্ধ বাবা মা, প্রিয় স্ত্রী, আদরের কন্যা, ছেলেকে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে। Y – এর সঙ্গে দেখা।
    Y – কোথায় যাচ্ছিস?
    X – খতমপুর যাচ্ছি । ডিজেল কিনতে। গায়ে আগুন ধরিয়ে নিজেকে শেষ করবো { ইসলাম বাদে অন্য কোনো ধর্ম ( সনাতন, খ্রিস্ট ,বৌদ্ধ)বা মতবাদ ( সেক্যুলারিজম, লিবারিজম, নিহলিজম ইত্যাদি )এ বিশ্বাসী ভেবে নিন }

    X – আমাকে একটু এগিয়ে দিবি? { কোনো একটা শিরকী কাজ বা মতবাদ ভেবে নিন ( সব ধর্মই সমান/ কোরআনের মানবতা বিরোধী ভার্স গুলো মানা যাবে না এই যুগে /পুজোয় চাঁদা দেওয়া / প্রসাদ খাওয়া ইত্যাদি ) করতে বা মানতে অনুরোধ করা}

    Y – হ্যাঁ। চল, সাইকেলে ওঠ। ( উপরের ব্র্যাকেটের মধ্যে কাজ গুলো করতে বা মতবাদ ও দর্শন গুলো মানতে সম্মতি প্রকাশ করা)

    X ফেসবুক এ স্ট্যাটাস দিল , আমার প্রাণের বন্ধু আজ আমাকে আত্মহত্যা করতে অনেক হেল্প করলো। পোস্ট এ প্রচুর লাইক , লাভ রিএক্ট পড়লো।কমেন্ট এ প্রশংসার বন্যা- “এই ভাবেই বেঁচে থাকুক মানবতা” ,” স্বাধীনতা দীর্ঘজীবী হোক” ,”আত্মহত্যায় সাহায্য করার জন্য আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ”,” এভাবেই এগিয়ে যাবে আমাদের দেশ”। { X ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিল আমার প্রাণের মুসলিম বন্ধু আজ ( পুজোয় মা দুর্গার মূর্তি কিনে দিল/ মন্দির তৈরিতে দান করলেন 5000 টাকা/ আমাদের সঙ্গে বসে একই থালায় প্রসাদ ভাগ করে খেলেন/ স্বীকার করলো কুরআনের সব কথা বর্তমান যুগে প্রযোজ্য নয়/ মেনে নিল সেক্যুলারিজম/ লিবারিজম/ কমিউনিজম সর্বশ্রেষ্ঠ, মতবাদ/ নামাজ শরীর ফিট রাখার জন্য, যারা সুস্থ, তাদের না পড়লেও চলবে/ আরবের মহিলা বেদুইনরা ধুলোবালি থেকে বাঁচার পর্দা করতো, তাই এটা বর্তমানে আমদের প্রয়োজন না, ইত্যাদি), লাইক, লাভ রিঅ্যাক্ট এ ভরপুর, কমেন্ট এ প্রশংসার বন্যা ” এটাই আমাদের ভারতবর্ষ”, ” ঘুচে যাক ধর্মীয় গোড়ামি, বেঁচে থাকুক মানবতা”, ” এই ভাবেই নিপাত যাক,ইসলামিক মৌলবাদ” ইত্যাদি}

    কিছুক্ষণ পর X আবার স্ট্যাটাস দিল ,” আত্মহত্যা করতে যাওয়ার পথে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম, তাই Y বন্ধু আমাকে জুস, প্রোটিন শেক খেতে দিল, খেয়ে , সুস্থ হয়ে আবার রওনা দিলাম” , আবার লাইক, লাভ রিঅ্যাক্ট এর বন্যা। কমেন্টে প্রশংসার ঝড়। ( X ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিল ” টাকার অভাবে মেয়েকে মুম্বাইতে মডেলিংয়ের জন্য পাঠাতে পারছিলাম না, বিকালে ট্রেন ছিল, সকালে বন্ধু এসে ৩০০০০ টাকা দিয়ে বললো , তোর মেয়ের স্বপ্ন পূরণ এর জন্য এই ছোট্ট প্রয়াস, পরে শুনলাম ও আমবাগান বেচে এই টাকা যোগাড় করেছিল”/ ক্রিসমাস পার্টিতে যাওয়ার জন্য ছোট ছেলের ‘সন্তাক্লস’ ড্রেস কিনে দিতে পারিনি, আজ বন্ধু এসে আমার ছেলেকে Santa Claus dress গিফট করলো, যাতে ভালো ভাবে ক্রিসমাস সেলিব্রেশন করতে পারে…। ফেইসবুকে লাইক এর ঝড়। কমেন্ট বক্স প্রশংসায় ভাসছে “ও বিশ্ব বিখ্যাত মডেল হোক,এই কামনা করি” / “ধর্ম যার যার, উৎসব সবার “, একজন “ধর্ম যার যার, কুরবানীর মাংসের দাওয়াত সবার” ,লেখার জন্য মানবতাবাদী , মুক্তমনারা মৌলবাদী, সন্ত্রাসবাদী ইত্যাদি বলে মানবধর্ম বজায় রাখলো)

    গল্প এই ভাবেই এগিয়ে চললো……

    সম্প্রীতি নিয়ে আমরা সবাই বেশি বাড়াবাড়ি বা অল্প ছাড়াছাড়ি করি। কোনো টাই কাম্য নয়।

    একজন মানুষ মারাত্মক ভুল মতবাদে বিশ্বাসী। যার শাস্তি পরকালে চিরজাহান্নামী হওয়া। সেখানে আমরা কিভাবে তার ভুলটাকে সাপোর্ট করতে পারি? কি ভাবে জাহান্নামের আগুনের দিকে ঠেলে দিতে পারি? কি করে এটা ভালোবাসা হয়? যার শেষ টা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।
    আমার ছোট্ট সন্তান যদি আগুন নিয়ে খেলতে যায়, আমি কি তাকে বারন করবো না? বলবো যাও তোমার ইচ্ছা কেও সম্মান করি!!!??? সন্তান রাগ করবে বা মনঃক্ষুণ্ণ হবে বলে তাকে ভুলটা ধরিয়ে দেব না?( নিজেকেও বললাম)
    কি করে বলি আগুনে ঝাঁপ দেওয়া আর বইএর পাতায় ডুব দেওয়া ,দুটোই সমান ?

    একটা মানুষ ভুলে ডুবে আছে , আর আমি তার ভুল তাকে সাপোর্ট বা সাহায্য করে বলছি সম্প্রীতি? 🤦🤦🤦। সে রাগ করবে বা মনঃক্ষুণ্ণ হবে বলে তাকে কোনো দিন সত্য টা জানাবো না?( নিজেকেও বললাম)

    উপরের পোস্টে দেখলাম শির্ক (সর্ব নিকৃষ্ট গোনাহ) , ও কিছু হারাম কাজ কে সম্পৃতির দোহাই দিয়ে বৈধ করা হয়েছে আর অনেক মেরুদণ্ডহীন না বুঝেই খুশি হয়ে আনন্দস্রু ঝরিয়েছে। সেই জন্যই লেখা।

    যৌক্তিক মতামত জানাতে পারেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here