সাহেবজাদা – A Tribute to Irfan khan

অনুপম ভট্টাচার্য,সৌমিক কান্তি ঘোষ ও নুপুর চক্রবর্তীর চোখে “সাহেবজাদা”

 

যদিও আমি খুব একটা টিভি দেখিনা, কিন্তু লকডাউনের স্বেচ্ছাবন্দিত্বে এখন প্রায়ই খবরের চ্যানেলগুলি সামনে থেকে পিছন কিংবা পিছন থেকে সামনে করতেই হচ্ছে।এরই মাঝে হঠাৎই একটা সিনেমা চ্যানেল এ দৃষ্টি থমকে গেল জনপ্রিয় হিন্দি সিনেমার হিরো-ভিলেনের প্রথাগত ফেমিং এ।

এখানে হিরো তিনজন আর ভিলেনের জায়গায় ইরফান খান। হিন্দি সিনেমার গুপ্ত বিশ্বের ‘ভাই’।বোম্বাইের বেতাজ বাদশা।আশ্চর্য লাগল তার অভিনয়ের শারীরিক পরিভাষায়।শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ।তথাকথিত বাণিজ্যিক সিনেমার বুদ্ধিহীন শরীর সর্বস্য ফ্রেম বিদীর্ণ করা বলবান নয়।অসততাকে কিভাবে বুদ্ধি দিয়ে বাঁধা যায় তার এক ভিন্ন আঙ্গিক।

অধ্যাপক সৌমিক কান্তি ঘোষ

আজ আর এই মানুষটি আমাদের মধ্যে নেই, মাত্র ৫৩ বছর বয়সে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক স্তরে একটা শূন্যতা সৃষ্টি করে চলে গেলেন।জয়পুরে জন্ম এবং মুম্বাইয়ে মৃত্যু।এর মাঝে করেছেন বহু দেশ-বিদেশের ছবি।শুরুতে টিভি সিরিয়ালও।

‘চন্দ্রকান্তা’ থেকে যার শুরু ভারত এক খোঁজ এর মধ্য দিয়ে সালাম বোম্বের একটি ছোটো ভুমিকায় হিন্দি সিনেমার ইতিহাসে পা রেখেছিলেন।যদিও ‘হাসিল’ ও ‘মকবুল’ সিনেমা থেকে তিনি নিজের জাত চেনাতে শুরু করেন।ব্রিটিশ ফিল্মে,The Warrior এবং হলিউড ফিল্মে দ্যা লাইফ অফ পাই কিংবা দ্যা আমেজিং স্পাইডার ম্যানে সাপোর্টইং চরিত্রে অভিনয় করলেও একবারও মনে হয়নি তিনি ভারতীয় অভিনেতা।

বারবার আমাদের ভাবতে বাধ্য করেছেন যে অভিনেতার কোনো ‘দেশ’ বা ‘জাত’ হয় না।তার একমাত্র পরিচয় তিনি অভিনেতা।

প্রশ্ন হল তিনি কি ধরণের অভিনেতা? ইন্টেলেকচুয়াল অ্যাক্টর নাকি ইনস্টিংক্টিভ? উত্তর দেওয়া শক্ত। আসলে চিত্রনাট্যের আঙ্গিকে নিজেকে এমনভাবে ধরিয়ে দিতেন যে দৃশ্যাংশটি তার মৌলিকত্বে দর্শক মনে স্থান করে নিত।নিজেকে ব্যাক্তিত্ব-শূন্য করে রাখতেন যাতে চরিত্রটা তার মধ্যে প্রবেশ করে যায়।

হয়ত ইরফান অভিনীত চরিত্রে কখন কখন মাইকেল রেডগ্রেভ বা অ্যালেক গীনেসের কথা মনে পড়ে যায়।শোনা যায় তিনি নাকি বাড়ি ফিরে বিভিন্ন হলিউডি ছবির চিত্রনাট্য পড়তেন।এখান থেকেই স্পষ্ট হয় এই মানুষটি অভিনয়ের ক্ষেত্রে প্রতিমুহূর্তে নিজেকে ইমপ্রোভাইজ করে যেতেন।এমনিতেই ইরফানের চেহারায় এবং শারীরিক ভঙ্গিতে চরিত্রকে গঠনগত অবয়ব দিয়ে দিতো।

ইরফান খান

আর যেটা পড়ে থাকত সেটা তার বুদ্ধিমত্তায় এবং সাবলীলতায় দর্শক মনে কার্যকারী প্রভাব ফেলতো।সহজে ভোলা যেতনা চরিত্রটাকে। “লাইফ অফ পাই” কিংবা “স্লামডগ মিলিয়নার” এর কথাই ধরুন।ভুমিকা ছোট্ট অথচ তার অভিনয়ের গুণে তার চারিত্রিক স্ফুরণ ছবি জুড়ে।

আসলে একটা বুদ্ধিজাত মাত্রা আর সহজাত অভিঘাতের প্রয়োগে ইরফান খান ছবির চরিত্রগুলিকে গল্পের পরাকাষ্ঠায় গেঁথে দেন।David Robinson বলেন, ‘Every word and gesture is recognisable’, হয়তো তাই। ইমোশনকে অ্যানাল্যাইজ করে এমনই কিছু চরিত্র সৃষ্টি করে গেলেন হিন্দি সিনেমায়।

লেখকঃ সৌমিক কান্তি ঘোষ (বিশিষ্ট চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞ, লেখক অধ্যাপক ) 

 

“জীবনটা শেষ অব্দি আসলে চলে যেতে দেওয়া, যাওয়াটার সাথে আপোস করে নেওয়া। তবে সবচেয়ে কষ্টের কি জানো, যাওয়ার মুহূর্তে ভালো করে যখন বিদায়টুকুও নেওয়া হয়না। ” 

“লাইফ অফ পাই” সিনেমার শেষ পর্যায়ে এসে ইরফান খান যখন স্বগোক্তির মত কথা কটা বলেছিলেন, সেই  সময় কে জানত যাওয়াটা তো আসলে এমন নিরবই হয়। অকস্মাৎ। আমরা যারা সাহিত্য, অভিনয়, সিনেমাকে   জীবনের

নূপুর চক্রবর্তী,সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার।

একটা বিশেষ অঙ্গ বলে ভেবে এসেছি, তারা ইরফান খানকেও সেই জীবনেরই একজন অন্দরমহলের মত দেখে এসেছি সারাজীবন।

 

শুধু চোখ দিয়ে, অনাবিল হাসি দিয়েই যে মানুষের একদম মনের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাওয়া যায়, উনি দেখিয়েছেন আমাদের বারবার। জীবনটা আসলেই একটা মহাযুদ্ধ ক্ষেত্র। এখানে দেখনদারি, জৌলুস দিয়ে ক্ষণিকের লাইমলাইটে আসা যেতে পারে, তবে আমরা ঐ যাকে বলে লেজেন্ড, তা ঠিক হওয়া যায় না।

সাধারণ হয়ে থাকতে গেলে, প্রতিটা সাধারণ মনে জায়গা করতে ঠিক যে অসাধারণত্ব প্রয়োজন, ইরফানের মধ্যে তা গোড়া থেকে ছিল।  মনে আছে, ছোটবেলায় মা ডিডি ন্যাশনালে একটা সিরিয়াল দেখতেন। ‘অনুগুঞ্জ’। মা বলতেন, দেখ এই ছেলেটি। ইরফান নাম। কি দারুণ অভিনয় করে। মা হিন্দি বিশেষ বুঝতেন না। তারপর ‘চন্দ্রাকান্তা’, ‘চাণক্য’র মত সিরিয়ালগুলোয় আস্তে আস্তে মানুষটা সবার কাছে পরিচিত হতে থাকলেন।

পরে একদিন হঠাৎ একটা গানের মাধ্যমে ইরফানকে দেখলাম। মা যে চোখের কথা বলতেন, বুঝলাম কি আলো তৈরি করতে পারেন ঐ দুটো চোখ দিয়ে।
কেমন যেন বুকের ভেতর অব্দি গেঁথে গেল গানের লাইন কটা।

“মেয়নে দিল সে কাহা, ঢুন্ড লনা খুশি
নাসমঝ, লায়া গম, তো ইয়ে গম হি সহি।”

সত্যি, মনের আর কি দোষ। পৃথিবীতে খুঁজতে গেলে আজও খুশির চেয়ে দুঃখই পাওয়া যায় বেশি। তবে দুঃখ পাওয়াটাই তে অপশন নয় জীবনে। এরপর ‘পিকু’ বা ‘করিব করিব সিঙ্গল’ এ কি অনায়াসে ইরফান প্রম করলেন, জয় করলেন, আর বুঝিশে দিলেন প্রেমটাও, আরও অনেককিছুর মত সাধারণই। ভালবাসতে দরকার শুধু দুটো মনের, দামী বিদেশী লোকেশনের বা গ্ল্যামারাস হিরোইনেরও নয়। প্রিন্সেপ ঘাটে গঙ্গার হাওয়ায়ও তা অনায়াসে হয়।

যারা ‘কারাভান’ দেখেছেন তারা নিশ্চয় বলতে পারবেন, ইরফান জীবন, প্রেম, গভীরতার সাথে সাথে কি প্রাণ খুলে হাসাতেও পারেন। সিনেমাটা দেখতে দেখতে ভুলে যাই কখন আমাদের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি এসে পড়েছে, আর ভাবিয়েছে, ‘এই মানুষটা জাস্ট অসম্ভব। ও পারে না এমন কিচ্ছু নেই।”

আমি ইরফানকে দেখিনি কখনও। তবে আমি জানি উনি শেষ অব্দি লড়ে গেছেন। অনবরত লড়ে গেছেন। যদিও উনিও মানতেন জীবন যখন লেবু দেয় আপনাকে, তা থেকে লেমনেড বানানোটা সত্যিই অত সহজ নয়৷ তবু, ইরফান আমাদের “রুহ’ হয়ে থেকে যাবেন আজীবন। আবার পর্দা উঠবে, জীবন এগিয়ে যাবে, আর কোথাও থেকে ইরফান সেই সিগনেচার হাসি হেসে বলে উঠবেন,

“দরিয়া ভি ম্যায়, দরখত ভি ম্যায়
ঝিলম ভি ম্যায়, চিনার ভি ম্যায়…..

ম্যায় থা, ম্যায় হুঁ, অউর ম্যায় হি রহুঙ্গা।”

লেখিকাঃ নূপুর চক্রবর্তী (সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার,নয়ডা)। 

 

চলে গেলেন ইরফান খান।

চলে গেলেন ইরফান খান। মাত্র তিপ্পান্ন বছর বয়সে। তাঁর মৃত্যুতে শুধু মাত্র মুম্বাই চলচ্চিত্র জগৎ নয়, বহু সাধারণ মানুষের মনেও গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে।

বিশিষ্ট রক্তযোদ্ধা অনুপম ভট্টাচার্য

রাজস্থানের জয়পুরে ইরফানের জন্ম। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মানো ছেলেটির বাসনা ছিলো অভিনেতা হওয়ার। আর সেই বাসনাই তাঁকে নিয়ে আসে ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামায়।

ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামা থেকে বেরিয়ে ইরফান তাঁর চলচ্চিত্র জীবন শুরু করেন মুম্বাইয়ে। ১৯৮৮ সালে “সালাম বোম্বে” চলচ্চিত্রে অভিনয় দর্শক, সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তারপর থেকে একের পর এক উল্লেখযোগ্য অভিনয়। হাসিল (২০০৩) তাঁকে ফিল্ম ফেয়ার শ্রেষ্ঠ খলনায়কের পুরস্কার এনে দেয়। মকবুল (২০০৪) আবার দর্শক হৃদয় জিতে নেয়। “লাইফ ইন আ মেট্রো” (২০০৭) অভিনেতা হিসাবে ইরফানের জাত চিনিয়ে দেয়। তাঁর টুপিতে ফিল্ম ফেয়ার সেরা সহ অভিনেতার পুরস্কার এনে দেয় এই সিনেমা। “পান সিং তোমর” এনে দেয় শ্রেষ্ঠ অভিনেতার জাতীয় পুরস্কার। “দ্য লাঞ্চ বক্স” (২০১৩) BAFTA পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন এনে দেয়।

একের পর এক চলচ্চিত্রে অভিনয় তাঁর মুকুটে একের পর এক পালক যোগ করেছে। ইরফান খান রয়েছে মানেই সেই সিনেমা ক্রিটিকদের কাছে আলাদা গুরুত্ব সৃষ্টি করেছে। ছোট রোল বা বড়ো রোল, লিড রোল বা সহ অভিনেতার ভূমিকা, ইরফান সব ক্ষেত্রেই সমান সাবলীল। হায়দার (২০১৪) বা গুন্ডে (২০১৪) মাঝারি মানের ব্যবসায়িক সাফল্য দিলেও ইরফান আবার ঝলসে ওঠেন “পিকু” (২০১৫) ছবিতে। অমিতাভ বচ্চনের সাথে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করতে যে কতটা ট্যালেন্ট প্রয়োজন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। পিকু ছবিতে দর্শক ইরফানের অভিনয় চিরকাল মনে রাখবে।

২০১৭ সালে কমেডি মুভির জগতে এক মাইলস্টোন স্থাপন করেন ইরফান। “হিন্দি মিডিয়াম” ছবিতে তাঁর অভিনয় আবার তাঁকে সংবাদ শিরোনামে নিয়ে আসে।

ইরফানকে শেষ দেখা গিয়েছিল ‘অংরেজি মিডিয়াম’ ছবিতে। যদিও এই ছবির প্রমোশন কিংবা স্পেশ্যাল স্ক্রিনিং, কোনওটাতেই হাজির ছিলেন না অভিনেতা। সূত্রের খবর, বেশ কয়েকদিন ধরেই অসুস্থ বোধ করায় গৃহবন্দি করে ছিলেন ইরফান।

আন্তর্জাতিক চলচিত্রেও ইরফান পা রেখেছেন সাফল্যের সাথে। ২০০১ এ “The Warrior” দিয়ে শুরু করে একের পর এক সাফল্য। “The Namesake” (২০০৬), “The Darjeeling Limited” (২০০৭), “Slumdog Millionaire” (২০০৮), “New York, I Love You” (২০০৯), “The Amazing Spider-Man” (২০১২), “Life of Pi” (২০১২), “Jurassic World” (২০১৫), “Inferno” (২০১৭), এক সে বড়কর এক সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে ইরফান বিদেশি চলচ্চিত্র প্রেমীদের কাছে অভিনেতা হিসাবে নিজের জাত চিনিয়ে দিয়েছেন। ২০১১ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রতিভা পাতিলের হাত থেকে পদ্মশ্রী সম্মান লাভ করেন অভিনেতা ইরফান।

১৯৯৫ সালের ২৩ শে ফেব্রুয়ারী ভালোবেসে বিয়ে করেন প্রেমিকা সুতপা শিকদার কে। দুই ছেলে বাবিল আর অয়ন কে নিয়ে আদ্যন্ত সংসারী ইরফান সেই বিরল ব্যতিক্রমী বলিউড অভিনেতা, যাকে নিয়ে কখনো কোনও ফিল্মি গসিপ মাথা চাড়া দেয়নি।

ইরফান খান চলে গেলেন কোনদিনও না ফেরার দেশে। তাঁকে অভিনেতা হিসাবে শুধু নয়, দেশের মানুষ মনে রাখবে একজন সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ মুক্ত মানুষ হিসাবে। যেখানেই থাকুন, ভালো থাকবেন ইরফান। দেশ আপনাকে কোনদিনও ভুলবে না।

 

লেখকঃ বিশিষ্ট সমাজসেবী অনুপম ভট্টাচার্য 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here